বাংলাদেশ, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ইং ,

বিশ্বযুদ্ধ কি আসন্ন? যে কারণে জরুরি অবস্থার প্রস্ততির নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপের


প্রকাশের সময় :31 October, 2026 11:20 : AM

মো: হাসান মুরাদ :

বিশ্ব কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ববাসীর মনে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকার সাধারণ মানুষকে জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি আরও জোরালো করার আহ্বান জানাচ্ছে। এ অবস্থায় সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া বাসাবাড়িতে অন্তত তিন দিনের অতি প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী মজুত রাখার নির্দেশনা কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর বেসামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করার পদক্ষেপে মূল বার্তাটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

বিশ্ব কি তবে সত্যি সত্যিই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে? এর মানে কি তবে আসন্ন কোনো মহাযুদ্ধ?

মূলত সামরিক সংঘাত, সাইবার হামলা, অন্তর্ঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামাল দিতেই এই প্রস্তুতি। ইউক্রেনে রাশিয়ার দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তাকে এখন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে দেশগুলো।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করেছে। এতে জনজীবন, জনসেবা ও অবকাঠামো সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইউরোপের অনেক দেশ সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় সাধারণ নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। দেশভেদে ঝুঁকি ও অগ্রাধিকারের ধরণ ভিন্ন হলেও সবার একটাই প্রশ্ন—কেন এখনই এত তোড়জোড়?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফোর্ট্রেস’ পরিকল্পনা ও ৯০ দিনের প্রস্তুতি : যুদ্ধের মতো বড় কোনো সংকটে মার্কিন সামরিক বাহিনী কতটা সতর্ক, তার প্রমাণ মিলছে পেন্টাগনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে। ফরচুন এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন মূল ভূখণ্ডের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন বাইরের কোনো সাহায্য ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, সেই রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। ফোর্ট্রেস-এর মূল লক্ষ্যই হলো বিদ্যুৎ সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়লেও সামরিক স্থাপনা সচল রাখা।

এই পরিকল্পনার আওতায় তৈরি হচ্ছে সহনশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জ্বালানির কৌশলগত মজুত এবং বিকল্প সরবরাহ লাইন। অর্থাৎ, জীবনযাত্রার অবকাঠামো ধসে পড়লেও সামরিক অপারেশন যেন থেমে না থাকে। তবে একে আসন্ন কোনো যুদ্ধের ঘোষণা ভাবলে ভুল হবে। এটি কেবল যেকোনো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংকটের জন্য একটি সতর্কতামূলক প্রস্তুতি মাত্র।

যুক্তরাজ্যের বি রেডি প্রচার অভিযান নাগরিক সুরক্ষায় আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছে ব্রিটেন। গত ২২ অক্টোবর চালু হয়েছে হালনাগাদ ‘বি রেডি’ প্রচার অভিযান। এতে বলা হয়েছে, বড় ধরনের বিপর্যয়ে স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষ যেন অন্তত তিন দিন নিজেদের দায়িত্বে চলতে পারে। খাবার পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, ফার্স্ট-এইড কিট, নগদ অর্থ ও রেডিওর মতো জরুরি জিনিসপত্র ঘরে রাখতে বলা হয়েছে নাগরিকদের।

জরুরি সেবার ওপর চাপ কমাতে এবং সাইবার হামলা বা অন্তর্ঘাতের মতো আধুনিক হুমকি মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও সরাসরি ভূখণ্ডগত হুমকির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করা নয়, বরং সংকটে তাৎক্ষণিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোই এর মূল উদ্দেশ্য।

জাপানের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে পরিকল্পনা
জাপানের এই আগাম প্রস্তুতির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আগামী ২ নভেম্বর নতুন ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’র কার্যক্রম শুরুর পর দেশজুড়ে জরুরি আহ্বান জানানো হতে পারে। দুর্যোগের প্রথম তিন থেকে সাত দিন আত্মনির্ভরশীল থাকতে নাগরিকদের পর্যাপ্ত খাবার পানি ও স্যানিটেশন সামগ্রী কাছে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পাশাপাশি সামরিক ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে ভৌত অবকাঠামোও শক্তিশালী করছে দেশটি। চলতি বছরের মার্চে ‘দ্য জাপান টাইমস’ জানায়, যেকোনো সামরিক হামলার হাত থেকে বাঁচাতে শহরাঞ্চলে আরও বেশি ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা হচ্ছে।

রাশিয়ার আশপাশের দেশগুলোর সর্বাত্মক প্রতিরোধ প্রস্তুতি
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাবোধ পাল্টে দিয়েছে পুরোপুরি। ফিনল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া) ২০২২ সালের পর থেকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর সংস্কার, জরুরি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের প্রশিক্ষণ এখন নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

পোল্যান্ড: নতুন প্রতিরক্ষা আইন পাসের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার কাজ ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। একইসাথে ২০২৫ সালে পাস হওয়া একটি বেসামরিক প্রতিরক্ষা আইনও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য একটি বৃহত্তর কাঠামো প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে।

ফিনল্যান্ড: দেশটির ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা সম্প্রতি নেটওয়ার্কটির কৌশলগত মজুদ সম্প্রসারিত করেছে। পাশাপাশি দেশটি জরুরি সরবরাহ সংস্থা নয় মাসের চাহিদা মেটানোর মতো শস্য মজুদ বাড়িয়েছে।

সুইডেন: দেশটির সরকার সামরিক প্রস্তুতির সাথে বেসামরিক প্রস্তুতিকে সমন্বয় করে তার সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা নীতি পুনরুজ্জীবিত করেছে। হালনাগাদ নির্দেশনায় বাসিন্দাদের সশস্ত্র হামলার সম্ভাবনাসহ গুরুতর সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

বাল্টিক রাষ্ট্র: এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া বেসামরিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জোরদার করেছে, যার মধ্যে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা সুরক্ষার পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইউক্রেন সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে ইউরোপ বুঝতে পেরেছে, আধুনিক যুদ্ধে কেবল সম্মুখ সমর নয়, বরং সাইবার হামলা বা বিদ্যুৎ গ্রিডে নাশকতা চালিয়েও একটি দেশকে অচল করে দেওয়া সম্ভব। তাই দীর্ঘসময় দেশীয় ব্যবস্থা সচল রাখার এই তোড়জোড় শুরু করেছে দেশগুলো।

ইউরোপীয় কমিশন গত বছর ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সাইবার আক্রমণ কিংবা জলবায়ুজনিত দুর্যোগ—সব ক্ষেত্রে সরকার ও সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে এতে। সীমান্ত পেরিয়ে যাতে কোনো সংকট জ্বালানি বা পরিবহন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করতে না পারে, সেজন্য ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি তবে দরজায় কড়া নাড়ছে?
সাম্প্রতিক সময়ের এই প্রস্তুতি বাস্তব হলেও এর অর্থ এই নয় যে, কালই কোনো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জাপানের প্রস্তুতিগুলোর ধরণ ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। পেন্টাগন নজর দিচ্ছে সামরিক ঘাঁটির ওপর, জাপান ভাবছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে, আর ইউরোপের লক্ষ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা।

ভবিষ্যতের কোনো বিপজ্জনক পরিণতির জন্য আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া আর তা নিশ্চিতভাবে ঘটবে বলে ধরে নেওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে প্রস্তুত থাকা সবসময়ই বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণ মানুষের জন্যও বার্তাটি পরিষ্কার যুদ্ধ আসন্ন না হলেও আকস্মিক যেকোনো বিপর্যয় এড়াতে প্রাথমিক প্রস্তুতি রাখা সবসময়ই নিরাপদ।

ট্যাগ :