তানভীর আহমেদ (বিশেষ প্রতিনিধি):
দেবী দুর্গার অন্নপূর্ণা রূপে মানুষের ক্ষুধা, অভাব-অনটন ও খাদ্য নিরাপত্তার বার্তা ব্যতিক্রমী এমন উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বোয়ালখালীর বীণাপাণি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে মণ্ডপের নান্দনিক সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও সৃজনশীল ভাবনার প্রশংসা করেন তিনি।
এদিকে, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে চট্টগ্রাম জেলায় নতুন প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ যুক্ত হয়েছে। উৎসবের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন ১২ হাজার আনসার সদস্য ও পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। গুজব, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হবে।
বৃহস্পতিবার বোয়ালখালীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এসব তথ্য জানান।

বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে এবার অন্নপূর্ণা রূপে উপস্থাপন করেছেন আয়োজকেরা। এর মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যেন খাদ্য পায় এবং কোনো পরিবার যেন ক্ষুধার্ত না থাকে এমন মানবিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
মণ্ডপের আয়োজন দেখে জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপ দেখেছি। কিন্তু এখানকার ভাবনাটা খুবই আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। এতে মেধার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
পূজামণ্ডপের সভাপতি প্রবীর চৌধুরী বলেন, হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে অন্নপূর্ণা অন্ন ও প্রাচুর্যের দেবী। দেবী দুর্গাকে এ রূপে উপস্থাপনের মাধ্যমে শুধু অসুরবিনাশিনী শক্তি নয়, মানুষের জীবনরক্ষা, মমতা ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের মূল বার্তা পৃথিবীতে কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, প্রতিটি ঘরে যেন খাবার থাকে। দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ মণ্ডপটি দেখতে আসেন। তাঁদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত শীতলীকরণব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আয়োজন যত সুন্দরই হোক, দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে তা উপভোগ করতে না পারলে আয়োজনের সার্থকতা থাকে না।
এর আগে জেলা প্রশাসক বোয়ালখালীর প্রায় ২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মেধসমুনি আশ্রম পরিদর্শন করেন। সেখানে পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘুরে দেখেন তিনি।
জেলা প্রশাসক জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিত্র তুলে ধরতে প্রশাসন কাজ করছে।
তিনি বলেন, এবার দুর্গাপূজায় সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশে গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ বেড়েছে। চট্টগ্রাম জেলাতেই নতুন মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ৪০০টি।
জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, শুক্রবার থেকে জেলার সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হবে। পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টহল, সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মণ্ডপের প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, সবকিছু মিলিয়ে আমরা পূজামণ্ডপগুলোকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেব।
পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব, ভুয়া সংবাদ, অপপ্রচার ও নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, এসব বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবকদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জন সূর্যাস্তের আগেই সম্পন্ন করতে আয়োজকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক জানান, আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফর করবেন। নগরের জেমসন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের আয়োজনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি পাওয়ার কথা জানান তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। উৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সবার সহযোগিতায় এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।






