বাংলাদেশ, রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬ ইং ,

শিরোনাম

ভাড়াটিয়া থেকে নিজস্ব ভবনে বিপিসি, ভবনটিকে বিতর্কিত করতে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ


প্রকাশের সময় :29 August, 2026 10:47 : AM

স্টাফ রিপোর্টার :

প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ দশক পর নিজস্ব স্থায়ী অফিস ভবন পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। চট্টগ্রামের সার্সন রোডের জয়পাহাড় এলাকায় বিপিসির নিজস্ব প্রায় ৩০ একর জায়গার মধ্যে নির্মাণাধীন এ ভবনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভাড়া অফিস থেকে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের মান, পানি পড়া ও কিছু স্থানে ফাটলকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা ও প্রশ্নও উঠেছে। তবে বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনটি এখনো নির্মাণাধীন এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই সব ধরনের ত্রুটি সংশোধন করা হবে।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময়েও সংস্থাটির নিজস্ব স্থায়ী অফিস ভবন নির্মিত হয়নি। ১৯৯০ সালে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। এরপরও দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া করা ভবনেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিএসসি ভবনে অফিস ভাড়া বাবদ বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা হিসেবে ২৫ বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকা ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছে। এর পাশাপাশি গাড়ির জ্বালানি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও অনেক বেশি বহন করতে হয়েছে। এ ভবনটি জয়পাহাডে নির্মিত হওয়ায় এ ব‍্যয় অনেক কমে গেছে।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নির্মাণ শুরু

বিপিসির নিজস্ব জায়গায় বহুতল অফিস ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৫ সালের পর। তবে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টার উদ্যোগে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় বলে বিপিসির কর্মকর্তারা জানান। দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্টিল স্ট্রাকচার ভবন নির্মাণ করে বিপিসির কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিপিসির দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিএসসি ভবনের ভাড়ার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং সেখানে মেরামতকাজ শুরু হওয়ায় নতুন ভবনে কার্যক্রম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিপিসির আশা, আগামী এক মাসের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক কতৃপক্ষ নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

ডিজাইন ও নির্মাণকাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তদারকি

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ভবনটির ডিজাইন ও নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মডার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবনের ডিজাইন ও ড্রয়িং প্রণয়ন করেছে এবং অনুমোদিত ডিজাইন-ড্রয়িং ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেডের নির্মাণকাজের গুণগত মানও সুপারভিশন করছে।

এ ছাড়া ভবনটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অনুমোদনের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পানি পড়া ও ফাটল নিয়ে প্রশ্ন

নির্মাণাধীন ভবনটিতে পানি পড়া এবং কিছু স্থানে ফাটলের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনটি এখনো নির্মাণাধীন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। ষষ্ঠ তলার নির্মাণকাজ চলমান থাকায় কিছু স্থানে সাময়িকভাবে পানি পড়ার সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে এবং তারা তা সমাধানের কাজ করছে।

ভবনটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে নৌবাহিনীর অধীন চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড।

বিপিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভবনের কাজ শেষ হওয়ার আগে সব ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। ফলে হস্তান্তরের আগে নির্মাণকাজের সব ত্রুটি ড্রাইডক কতৃক যথাযথভাবে সংশোধন ও পরীক্ষা করে নেওয়া হবে।

প্রকৌশলীদের মতে, নির্মাণাধীন ভবনে পানি পড়া বা ইটের গাঁথুনি, প্লাস্টার ও স্টিলের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় মেরামত করা জরুরি। তবে স্টিল স্ট্রাকচার ভবনে ইটের গাঁথুনি বা প্লাস্টার ও স্টিলের সংযোগস্থলে তৈরি হেয়ারলাইন ক্র্যাক সবসময় ভবনের মূল কাঠামোগত দুর্বলতার প্রমাণ নয়। এ ধরনের ফাটল মূলত ভবনের বাহ্যিক সৌন্দর্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের মতে, ভবন হস্তান্তরের আগে ত্রুটি সংশোধন করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় পরবর্তীতে ত্রুটির দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ ও ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আলাদা প্রকল্প পরিচালক নেই, রয়েছে মনিটরিং কমিটি

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, ভবনটির জন্য আলাদা কোনো প্রকল্প পরিচালক না থাকলেও নির্মাণকাজের মান পর্যবেক্ষণে পরামর্শকের পাশাপাশি বিপিসির উচ্চপর্যায়ের একটি মনিটরিং টিম রয়েছে। তাছাড়াও বিপিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ থেকেও নিয়মিতভাবে নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও মান তদারকি করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রোস্টারের মাধ্যমে নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করছেন বলে কর্মকর্তারা জানান। এক্ষেত্রে উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মো. আপেল মামুন এর নির্মাণকাজের বিষয়ে পিডি বা এককভাবে তদারকির কোন ভূমিকা পাওয়া যায়নি।

আরো জানা যায় ভবনের ডিজাইন-ড্রয়িং প্রনয়ন এবং চুক্তির শর্ত ও নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মডার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের কতৃক বিপিসির পক্ষে তদারকি করছে।

আধুনিক স্টিল স্ট্রাকচার ভবন

বিপিসির কর্মকর্তাদের দাবি, নির্মাণাধীন ভবনটি আধুনিক স্টিল স্ট্রাকচার প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। এতে লিফট, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও এক্সেস কন্ট্রোল, বোর্ডরুম, পৃথক সভাকক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনের জন্য কক্ষ এবং ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের ধারণক্ষমতার হলরুমসহ বিভিন্ন আধুনিক সুবিধা থাকবে।

প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের মতে, স্টিল স্ট্রাকচার ভবনের অন্যতম সুবিধা হলো তুলনামূলক কম সময়ে নির্মাণ করা যায় এবং ভবিষ্যতে নকশায় পরিবর্তন এনে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকে। তবে এর ব্যয় সাধারণ আরসিসি ভবনের তুলনায় শতকরা ১.৫ থেকে ১.৭ গুন বেশি হতে পারে।

বিপিসিকে চট্টগ্রামে থেকে ঢাকায় নেওয়ার ষড়যন্ত্র

এদিকে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। চট্টগ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি মহল বিভিন্ন অজুহাতে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের চেষ্টা করছে।

তাদের যুক্তি, বিপিসির অধীন আটটি তেল বিপণন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চট্টগ্রামে অবস্থিত। দেশের আমদানি করা জ্বালানি তেলের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে খালাস হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ফলে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা যৌক্তিক বলে তারা মনে করেন।

তাদের আরও বক্তব্য, সরকার যদি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণে গুরুত্ব দেয়, তাহলে চট্টগ্রামে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের উদ্যোগ সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

বিপিসির নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘদিন আটকে থাকার পেছনে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা ছিল বলে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আকতারুজ্জামান চৌধুরী এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নামও অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এ ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

ভবন নির্মাণ বন্ধের অপচেষ্টা নিয়ে অভিযোগ

চট্টগ্রামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ভবনের পানি পড়া বা অন্যান্য ছোটখাটো নির্মাণগত বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করে একটি মহল ভবনটির নির্মাণকাজ প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তাদের আশঙ্কা, এর পেছনে ভবিষ্যতে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের স্বার্থ থাকতে পারে। তাদের দাবি প্রায় পাঁচ দশক পর বিপিসি নিজস্ব ভবন পেতে যাচ্ছে—এটি প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একই সঙ্গে সরকারি অর্থে নির্মিত এ ভবনের নির্মাণমান, নিরাপত্তা, নকশা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের আগে পানি পড়া, ফাটল, অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা , পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মডার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের ডিজাইন-ড্রয়িং, চুক্তির শর্ত এবং ড্রাই ডক লিমিটেডের নির্মাণকাজ সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন অনুযায়ী বাস্তবায়ন—সবকিছু সমন্বিতভাবে বুঝে নেওয়া উচিত।

বিপিসির নিজস্ব ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের ভাড়া ব্যয়ের অবসান ঘটতে পারে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী সাংগঠনিক অবকাঠামোও তৈরি হবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নির্ধারিত ডিজাইন-ড্রয়িং ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা, চিহ্নিত ত্রুটিগুলো সংশোধন করা এবং যথাযথ ভবনটি।

ট্যাগ :