বাংলাদেশ, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ ইং ,

শিরোনাম

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জাল দলিল সৃজনে জমি দখল ও দোকান ঘর নির্মাণের অভিযোগ


প্রকাশের সময় :21 June, 2026 11:58 : PM

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মধ্যম কাঞ্চনা ৪ নং ওয়ার্ডে জাল দলিল সৃজন করে নন্দী পাড়া এলাকায় হিন্দুদের শবদাহ করার স্থান শ্মশানভূমির অংশ সহ অন্যান্য ভূমি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি ও দখল করে শ্মশানের উপর নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে বাণিজ্যিক ভাবে দোকান ঘর নির্মাণ করার অভিযোগ উঠেছে সমীর নন্দী গং নামের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। সমীর নন্দী ওই এলাকার রেবতী রঞ্জন নন্দীর ছেলে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে সমীর নন্দী, মো. ওসমান ও মো: রুবেলকে বিবাদী করে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত চট্টগ্রামে (দক্ষিণ) একটি মামলা দায়ের করেন, যাহার মামলা নং- ১১২২/২০২৪ ও সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরও একটি মামলা দায়ের করেন, যাহার মামলা নং-৫৯০/২০২৫ এবং একই ঘটনায় অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ ট্রাইব্যুনালে, চট্টগ্রাম ( বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রাম) এ একটি মামলা যাহার ট্রাইব্যুনাল মামলা নং- ৩৫৫৩/২০১২, সূত্র : ভি.পি.কেইচ নং- ১৬০/৮০-৮১ চলমান রয়েছে।

ভুক্তভোগী বিজয় একই এলাকার মৃত গোপাল কৃষ্ণ নন্দীর ছেলে। এর মধ্যে ৫৯০/২০২৫ মামলাটির গতকাল ২১ জুন আদালত শুনানি শেষে আসামি সমীর নন্দীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন বলে নিশ্চিত করেন বাদীর আইনজীবী এড. শুভাশীষ শর্মা।

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাল জালিয়াতি মাধ্যমে বিক্রি ও জবর দখলে নেওয়া সম্পত্তি বাদীর মৌরশী সম্পত্তি। যা তাদের নামে নামজারি খতিয়ান সৃজন করে দীর্ঘ বছর ধরে তাদের নামে সরকারি খাজনা পরিশোধ করে ভোগ দখলে রয়েছে। অন্যদিকে বিবাদী সমীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তিতে কোনো ধরনের স্বত্ব-স্বার্থ না থাকা সত্ত্বেও বাদী গংয়ের সম্পত্তি জবর দখল করার পায়তারায় লিপ্ত রয়েছে। সমীর নন্দীর এমন কর্মকান্ডে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বাধা দিলে পরবর্তীতে সমীর নন্দী সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বাদী গংদের প্রাণনাশের হুমকি ধামকি দিয়ে আসছিলো। পরবর্তীতে বাদীর মৌরশী ওই সম্পত্তি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে একটি দলিল সৃজন করে তাহা ওসমান নামের এক ব্যক্তির নিকট বিক্রি ও চুক্তির ভিত্তিতে সমীর নন্দী লাগিয়ত করে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকাল ১১ টায় সমীর নন্দী, ওসমান ও তার সহযোগীরা সহ অবৈধ ভাবে ভূমির উপর দোকান ঘর নির্মাণ করার লক্ষ্য ইট, বালি, সিমেন্ট এবং নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত কোদাল, সাবল নিয়ে প্রবেশ করলে, ভূমিতে প্রবেশ করতে বাধা দেন বিজয় কুমার নন্দী গংয়েরা। এতে সমীর নন্দী ও ওসামান সহ অন্যান্য সহযোগীরা মিলে বিজয় কুমার নন্দী গংদের হামলার চেষ্টা করলেও স্থানীয় লোকজনের চাপের মুখে চলে যান বলে বিজয় কুমার নন্দী উল্লেখ করেন তার দায়ের করা মামলায়।

পরবর্তীতে বিজয় কুমার নন্দী বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সমীর নন্দী, মো. ওসমান ও মো.রুবেল এর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৩/৪ জনকে বিবাদী করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত ( দক্ষিণ) চট্টগ্রাম একটি মামলা দায়ের করিলে, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সহকারী কমিশনার ( ভূমি) সাতকানিয়াকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে একই বিষয় নিয়ে ২০২৫ সালে ১৪ জুলাই আবারও বিবাদ সৃষ্টি হলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ১ আদালতে সমীর নন্দীকে বিবাদী করে আরও একটি মামলা দায়ের করেন বাদী বিজয় কুমার নন্দী, যে মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

এমতাবস্থায় মামলা চলমান থাকলেও সমীর নন্দী, ওসমান ও অন্যান্য সহযোগীরা মিলে প্রভাব খাটিয়ে আইন অমান্য করে বিজয় কুমার নন্দী গংদের ভূমির উপর পুরনো শ্মশানের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে আরও অন্যান্য জমি অবৈধ ভাবে দখলে নিয়ে দোকান ঘর নির্মাণ করে বলে বাদী বিজয় কুমার নন্দী মামলায় উল্লেখ করেন।

ঘটনার বিষয়ে বাদী বিজয় কুমার নন্দী জানান, বিবাদী সমীর নন্দী তার আত্নীয় হন। বিরোধী জমি ৭০ দশকের দিকে অর্পিত হলে পরবর্তীতে রেবতী নন্দী ( সমীর নন্দীর পিতা) সরকারের কাছ থেকে একসনা লিজ গ্রহণ করেন, যাহা বর্তমানে মামলা চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, সমীর নন্দীর ৪ ভাইয়ের মধ্যে ১ ভাই মৃত দুই ভাই ভারত বসবাস করেন। সমীর নন্দী দীর্ঘ বছর ধরে চট্টগ্রামে ডেকোরেশন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে পরিবার নিয়ে নগরে বসবাস করতেন। বর্তমানে কোনো কাজ না থাকায় এসব জাল জালিয়াতি নিয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। অন্যদিকে মো. ওসমান দীর্ঘ বছর প্রবাসে থাকতেন। সমীর আর ওসমানের দীর্ঘ বছরের পরিচয়। ওসমান প্রবাস থেকে আসার পর সমীরকে ভূমি দখলের কু-প্ররোচনা দিয়ে আসছেন ওসমান। এক পর্যায়ে সমীর একটি জাল দলিল সৃজন করে তার পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে আসছে বহুদিন ধরে। বিষয়টি বাদী বিজয় কুমার নন্দী গং জানার পর ওই দলিল ভুয়া বলে জানান সমীরকে। এতেই বাঁধে বিপত্তি। এর মধ্যে কোনো এক সময় ওসমান ও সমীর নন্দী যোগসাজশ করে স্ট্যাম্প মূলে শ্মশানভূমির অংশটি অগ্রিম টাকা নিয়ে চুক্তি ভিত্তিক লাগিয়ত করেন। পরে ওসমান মামলা চলমান অবস্থায়ও ওই শ্মশানভূমির উপর দোকান ঘর নির্মাণ করে বলে জানান বিজয় কুমার নন্দী।

বিবাদী সমীর নন্দীর কাছে জাল জালিয়াতি ও দখলের বিষয় জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে জানান, আমি আমার পৈত্রিক সম্পত্তি আমার প্রাপ্য অংশ থেকে ওসমান নামের একব্যক্তির কাছে ৪ শতক ( দুই গন্ডা) জমি একলক্ষ টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসিক ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় পাঁচ বছরের জন্য লাগিয়ত করেছি, বিক্রি করিনি।
অন্যদিকে সমীর নন্দীর কাছ হতে জমি গ্রহীতা মো. ওসমান জানান, সমীর নন্দীর টাকার প্রয়োজন হওয়ায় আমি তার কাছ হতে টাকার বিনিময়ে কিছু জমি মাসিক ভাড়া, কিছু বায়না রেজিস্ট্রাট এবং কিছু আমমোক্তার নামা মূলে গ্রহীতা হিসেবে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। আমি কোনো ভাবে জবর দখল বা জাল জালিয়াতিতে যুক্ত নয়। হিন্দুর শ্মশান ভূমির উপর দোকান ঘর কেন নির্মাণ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ওসমান বলেন, আমি কোনো শ্মশানের উপর দোকান ঘর নির্মাণ করিনি। শ্মশান বাদ দিয়ে আমি ৪ শতক জমির উপর দোকান ঘর নির্মাণ করেছি। কেউ যদি বলে দোকান ঘর নির্মাণ স্থানে শ্মশান, মন্দির, মসজিদ কিংবা মাদরাসার ভূমি রয়েছে তাহলে আমি জমি ছেড়ে চলে যাবো। তিনি আরও বলেন, আমি যতটুকু জানি ওই পুকুর পাড়ে শুধু ১ শতক জমির উপর সমীর নন্দীর পিতার শ্মশান মন্দির রয়েছে। যেহেতু আমার জানা মতে ওখানে সমীর নন্দীর সম্পত্তির অংশ রয়েছে এবং আমার কাছে হস্তান্তর করেছে, সেহেতু আমি ক্রেতা হিসেবে দখলে যেতে পারি। আর বিষয় গুলো নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে, তাই আইনে যা হয় তা হবে।

স্থানীয়রা জানান, আমরা যতটুকু জানি বা দেখি নন্দী বাড়িটা রজনী কান্ত নন্দীর বাড়ি। তার ছেলে ছিলো গোপাল কৃষ্ণ নন্দী, অক্ষয় নন্দী ও সুভাষ নন্দী। বর্তমানে যারা ভোগ দখলে আছেন তারা হলেন, উত্তম কুমার নন্দী, বিজয় কুমার নন্দী, সুজয় নন্দী শৈবাল সহ তাদের বংশের লোকেরা। উত্তম, বিজয় ও সুজয় গোপাল কৃষ্ণ নন্দীর ছেলে। আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি তারা এই জমিতে নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করে ভোগ দখলে রয়েছে। সমীর নন্দী বহু বছর আগে থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করে। স্থানীয়রা আরও বলেন, আমাদের জানা মতে সমীর নন্দীর বর্তমানে বাড়ি ভিটা ছাড়া আর কোনো জমি দখলে নাই। যা ছিলো তা নিয়ে সরকারের সাথে মামলা চলমান রয়েছে। কিন্তু আমরা শুনতে পাচ্ছি সমীর নাকি বিরোধীয় জমি লিজ নিয়েছেন এবং ওসমানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। তবে মামলা চলমান অবস্থায় কি লিজ আর চুক্তিবদ্ধ হয় তা আমাদের জানা নেই।

ট্যাগ :