
স্টাফ রিপোর্টার :
বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট তরিকুল ইসলাম (৩৭) নামে এক মাদক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তার হওয়ার ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়ে যান। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয় এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বেশ বিস্মিত হন।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তি (তরিকুল ইসলাম) আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য। তার দেওয়া তথ্যে ঢাকার গ্রিন রোডের বাইতুল লাজ নামে একটি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে প্রায় দেড় লাখ ট্রামাডল বড়ি উদ্ধার করা হয়। ট্রামাডল একটি অপ্রচলিত মাদক। এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলে খ শ্রেণিভুক্ত মাদক। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির কাছে এ ধরনের মাদক পাওয়া গেলে পরিমাণভেদে ১ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরিকুল নিজেই ট্রামাডল বিদেশে নিয়ে যেতেন। এ জন্য ভিসা করাতে তিনি একটি দেশের দূতাবাসে গিয়েছিলেন। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোয়েন্দা তথ্য পায় এবং তাকে গ্রেপ্তার করে।
সেই তরিকুলের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে জামিনের খবর ২১ আগস্ট গণমাধ্যমে প্রচারের পর আদালত ২৪ আগস্ট বলেন, জামিনের আদেশটি ছিল অন্যায্য ও বেআইনি। পরে তরিকুলসহ দুই আসামির জামিন বাতিল করার আদেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন।
সেদিন আদালত বলেছিলেন, আসামি তরিকুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়াকে জামিন দেওয়ার আদেশটি তড়িঘড়ি করে দেওয়া, পক্ষপাতমূলক ও অন্যায্য। মামলার গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পষ্ট হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট ভুলভাবে জামিনের আদেশ দিয়েছেন। এ কারণে সেটি বাতিল করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো মাদক উদ্ধারের পর তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। ওই ঘটনায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলা ও জব্দ তালিকা করা হয়েছিল। এরপরও তরিকুল ইসলাম জামিন পেয়ে যান। যদিও জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার।
তবে নতুন মাদক মামলায় সেই তরিকুলের গ্রেপ্তারের খবর দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, অপ্রচলিত মাদক ট্রামাডল নিয়ে ধরা পড়া তরিকুল বিচার বিভাগে কর্মরত পরিবারের একজন সদস্যের সহযোগিতায় জামিন পেয়েছিলেন। তবে এ বছর আবারও তরিকুল মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। এখন তিনি কারাগারে আছেন।
সারা দেশে প্রায় প্রতিদিনই মাদক মামলায় শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছেন। তাদের অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবার মাদক কারবারে জড়াচ্ছেন। সূত্র বলছে, দেশের মোট মাদক মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশই বর্তমানে বিচারাধীন এবং অমীমাংসিত অবস্থায় আছে।
শুধু তাই নয়, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধীর গতি ও নানা জটিলতার কারণে সারা দেশের আদালতগুলোতে ৮৬ হাজার মামলা ঝুলে আছে। বিপুলসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকায় মাদক মামলার তদন্তের মান, প্রমাণ সংগ্রহ ও বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনজীবীরা।
তারা বলছেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। কিন্তু মামলা প্রতিদিন জমছে। যে হারে মামলা জমছে সে হারে নিষ্পত্তি ও সুরাহা মিলছে না। মামলার ফায়সালা দ্রুত করা না গেলে অপরাধীরা যেমন পার পেয়ে যাচ্ছে, তেমনি যারা নিরপরাধ তারা থেকে যাচ্ছে অনিশ্চয়তায়।
দেশের ৬৪ জেলার বিচারিক আদালতে ৪ লাখ ২৬ হাজার ১১০টি মাদক মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ২০০টি। নিষ্পত্তির হার মাত্র ৩.৮০ শতাংশ। বর্তমানে ৪ লাখ ৩ হাজার ৯০৮টি মামলা বিচারাধীন, যা মোট মামলার প্রায় ৯৪.৭৯ শতাংশ।
মাদকবিরোধী অভিযানে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিদিন মাদক মামলার আসামি ধরছে, অন্যদিকে তাদের অনেকে সহজেই জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর নজরদারি রাখাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ, জামিননামার কপি পৌঁছানোর আগেই অনেক আসামি লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। জামিন অযোগ্য অপরাধ সত্ত্বেও যদি মাদক মামলার আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে যায় তাহলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সারা দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে দায়ের হওয়া মাদক মামলাগুলোতে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ জট। বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মোট মাদক মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশই বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ ছাড়া নির্ধারিত মেয়াদে মামলা নিষ্পত্তির হার নেমে এসেছে চার শতাংশেরও নিচে।
বিচারিক আদালতের মাদক মামলার পরিসংখ্যান সংক্রান্ত ‘অফিশিয়াল’ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে সংগ্রহ করা তথ্যানুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলার বিচারিক আদালতে নির্ধারিত ত্রৈমাসিক মেয়াদে মোট মাদক মামলার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ১১০টি। এর মধ্যে আগের মেয়াদের জের হিসেবে স্থানান্তরিত হয়ে আসা মামলার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪৭টি। এই সময়ে নতুন করে দায়ের করা হয় ১ হাজার ১৭৬টি মামলা এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত মামলার সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ৭৮৭টি।
বিশাল এই মামলার জট থেকে নির্দিষ্ট সময়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ২০০টি মামলা, যা মোট মামলার মাত্র ৩.৮০ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ হাজার ২টি মামলা বিচারিক প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৯০৮টি মাদক মামলা, যা মোট মামলার প্রায় ৯৪.৭৯ শতাংশ।
দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিভাগে মাদক মামলার চাপ ও বিচারিক জট সবচেয়ে প্রকট রূপ ধারণ করেছে। ঢাকা বিভাগে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ২২৬টি মাদক মামলার বিপরীতে বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় আছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৭টি। এই বিভাগে ওই মেয়াদে মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে ৫ হাজার ২০০টি।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৯৯ হাজার ১১৪টি মামলার বিপরীতে ৯৬ হাজার ৫৭০টি মামলা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সেখানে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৩৩১টি। এরপরই যথাক্রমে রাজশাহী বিভাগে ৮৭ হাজার ৬৩৯টি, খুলনা বিভাগে ৪৫ হাজার ৮০১টি এবং রংপুর বিভাগে ৪৩ হাজার ৯৯টি মামলা ঝুলে আছে।
মাদক মামলার বিচারিক জটে সবচেয়ে বেশি চাপ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। ঢাকা বিভাগে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৭টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৬ হাজার ৫৭০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একক বিচারিক এলাকা হিসেবে ঢাকা ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ৪৩১টি মামলা ঝুলে আছে।
সবচেয়ে কম মামলার চাপ দেখা গেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে মোট ১০ হাজার ৪৬১টি মাদক মামলার মধ্যে বিচারাধীন আছে ৯ হাজার ৮৬১টি।
জেলা ও ট্রাইব্যুনালভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহানগরী ও প্রধান বিচারিক এলাকাগুলোতে মামলার পাহাড় জমে আছে। দেশের একক বিচারিক এলাকা হিসেবে সর্বোচ্চ মাদক মামলা রয়েছে ঢাকা ট্রাইব্যুনালে। সেখানে মোট ৪৩ হাজার ৭৬২টি মামলার মধ্যে ৪০ হাজার ৪৩১টি মামলাই অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
একইভাবে চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ৪০ হাজার ৬৭৮টি মামলার বিপরীতে বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলছে ৩৯ হাজার ৬৯০টি। রাজশাহী ট্রাইব্যুনালে ২৬ হাজার ৭৭৩টি মামলার মধ্যে ২৬ হাজার ৫৯টি মামলাই বিচারাধীন। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ জেলায় ১৯ হাজার ১২৭টি, সীমান্ত এলাকা কক্সবাজার জেলায় ১৭ হাজার ৫১২টি এবং বগুড়া জেলায় ১৪ হাজার ৮৯৫টি মাদক মামলা বিচারিক আদালতে আটকে রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার বিধান রয়েছে। বর্তমানে মাদক সংক্রান্ত সকল অপরাধের বিচার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি।
তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে বদলি হয়ে যান। ফলে তাদের কাছে সমন বা নোটিশ পৌঁছাতে পৌঁছাতেই দুটি থেকে তিনটি ধার্য তারিখ পিছিয়ে যায়। অ্যাডভোকেট জামিউল হক বলেন,
আইনের ধারা ৪৬ অনুযায়ী, সকল মাদক অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য। ধারা ৪৭ অনুযায়ী, আদালত সহজে জামিন দিতে পারবে না, যদি না সে নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়। ধারা ৪৮ ও ৫১ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিচার দ্রুত, ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে। অর্থাৎ মাদক মামলায় জামিন অত্যন্ত কঠোর শর্তযুক্ত।
মাদক মামলার বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো বছরের পর বছর ধরে এসব মামলার শুনানি সম্পন্ন না হওয়া। সুপ্রিমকোর্টের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে ৮৫ হাজার ৯১১টি মাদক মামলা দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। যা মোট মামলার প্রায় ২০.১৫ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি এই মামলা জটে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ৩১ হাজার ৯৭৬টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় পার করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে এমন মামলার সংখ্যা ২৯ হাজার ১৩০টি। জেলা ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে ঢাকা ট্রাইব্যুনালে ১৯ হাজার ৫২৩টি, কক্সবাজারে ১২ হাজার ৭৪৪টি এবং চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ১০ হাজার ২৬টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়েছে।
অন্যদিকে, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে মোট ২০৬টি মাদক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মামলার বিচার কাজ বন্ধ রয়েছে ঢাকা বিভাগে, যার সংখ্যা ৮৯টি। এছাড়া রংপুর বিভাগে ৩২টি, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ১১টি করে মামলা বিচারিক স্থবিরতার মুখে আটকে রয়েছে। একক আদালত হিসেবে কেবল ঢাকা ট্রাইব্যুনালেই ৭৩টি মাদক মামলার বিচার কার্যক্রম হাইকোর্টের নির্দেশনার ফলে স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও অনেক মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে। বিচারক ও সরকারি কৌঁসুলির ঘাটতি এবং সাক্ষী হাজির করতে না পারার মতো কারণে এমন বিলম্ব হচ্ছে।
মাদকের মামলার জট ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ. এম. জামিউল হক (ফয়সাল) বলেন, মাদকের মামলায় সিজার লিস্ট বা জব্দ তালিকার সাক্ষী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেখা যায়, তালিকায় নাম থাকা সাক্ষী অনেক সময় পথচারী, যাদের পরবর্তীতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে নিয়ে আসা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, আদালতে প্রতিদিন মামলার ভীষণ চাপ থাকে। অন্যান্য মামলার পাশাপাশি শুধু একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
যারা মেসির সমালোচনা করে, তারা ফুটবলের কিছুই বোঝে না
তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ কম হলে আইনের সাজা ও সময়সীমা বিবেচনা করে বিচারকরা অনেক সময় জামিন দেন। কিন্তু যারা জামিন পেয়ে বারবার একই কারবারে জড়াচ্ছেন, তাদের জামিন বিবেচনার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের বিচারক এবং উচ্চ আদালতকে আরও সচেতন হওয়া উচিত।
বিচারিক বিলম্ব ও মামলা জট প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, সাক্ষী আসে না সময়মতো, কোর্ট তার ফাংশনিং করতে পারছে না। চার্জ হিয়ারিংয়ে আসামি পক্ষ সময় নিচ্ছে, পাবলিক প্রসিকিউটর সাহেব সময় নিচ্ছে। বিচারক ইচ্ছা করলেই চার্জ ফ্রেম করতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, মাদকের আসামিদের সাজা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। আমরা আমাদের প্রসিকিউশন ইউনিট তৈরি করেছি এবং সরকার ট্রাইবুনাল তৈরি করেছে, যেন দ্রুত মাদকের মামলাগুলো বিচার করা যায়। আর আমরা আমাদের যারা মাদকের মামলাগুলো রুজু করেন বা তদন্ত ও অনুসন্ধান করেন, তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি, তারা যেন যথাযথভাবে এফআইআর ও চার্জশিট তৈরি করতে পারেন এবং জব্দ তালিকা যেন ঠিকমতো প্রস্তুত হয়।
মাদক মামলার আলামত পরীক্ষা করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডির ল্যাবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, আমাদের কেমিক্যাল ল্যাবগুলোতে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো মামলার আলামত আসে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক সংক্রান্ত। অর্থাৎ মাসে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার শুধু মাদকের আলামতই পরীক্ষা করা হয়।
মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে গতি আনতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং মহানগরে ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার।
গত ৩ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৪৪ক ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ২২টি ‘
মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সেগুলোর জন্য পৃথক স্থানীয় এখতিয়ার ও সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাদক মামলার জট কমাতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার। এসব ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছর বা তার বেশি সাজাযোগ্য অপরাধের চলমান মামলা স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পুরোনো মামলাগুলোর নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা জেলা এলাকার জন্য একটি এবং ঢাকা মহানগরের আওতাধীন থানাগুলোর জন্য চারটি পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর অধীন ন্যূনতম ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের চলমান মামলাসমূহ বর্তমান আদালত থেকে নবগঠিত ট্রাইব্যুনালসমূহে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী স্থানান্তরিত হবে। কোনো মামলা যে পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে, ঠিক সে পর্যায় থেকেই বিচারকার্য পরিচালিত হবে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মাদকের মামলাগুলোর বিচার করার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল ছিল না। এসব মামলার বিচার নিয়মিত আদালতে অন্যান্য মামলার সঙ্গে হতো। যে কারণে আদালতের অপ্রতুলতা একইসঙ্গে সাক্ষীদের নিয়মিত আদালতে হাজির করতে না পারা মাদক মামলার বিচারে দীর্ঘ জটের প্রধান কারণ। এই সরকার আসার পর সারা দেশে মাদক মামলার বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল করেছে। আমাদের ঢাকা কোর্টে আলাদা চারটি ট্রাইব্যুনাল হয়েছে। বর্তমানে মাদক মামলার বিচার সেখানে দ্রুততার সঙ্গে হচ্ছে। প্রতিদিনই সাক্ষীরা আদালতে হাজির হচ্ছেন, তাদের সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি দ্রুতই এ জট থেকে বের হতে পারব।
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলে এই সরকারের সদিচ্ছা আছে। মাদক চক্রের কেবল বাহক বা খুচরা বিক্রেতা নয়, গডফাদারদেরও অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং তাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আমরা পাঁচ বছরের পুরোনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছি এবং রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মাদকের মামলায় জামিনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখা হচ্ছে।
প্রযুক্তির সহায়তায় সাক্ষগ্রহণের পরামর্শ আইনজীবীদের
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট জামিউল হক বলেন, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে বদলি হয়ে যান। ফলে তাদের কাছে সমন বা নোটিশ পৌঁছাতে পৌঁছাতেই দুটি থেকে তিনটি ধার্য তারিখ পিছিয়ে যায়।
তিনি বলেন, এই সমস্যার সমাধানও আছে। বদলিসূত্রে দূরে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সাক্ষ্য নেওয়া গেলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সময় বাঁচানো সম্ভব।