
মো: হাসান মুরাদ :
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ একে অপরকে অভিবাদন জানানোর জন্য বিভিন্ন রীতি মেনে চলে। কেউ হাত মেলান, কেউ জড়িয়ে ধরেন, কেউ আবার গালে চুমু দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। কিন্তু জাপানে কাউকে অভিবাদন জানাতে বা সম্মান দেখাতে মানুষ সাধারণত সামনের দিকে শরীর ঝুঁকিয়ে মাথা নত করেন। জাপানি ভাষায় এই প্রথার নাম ওজিগি।
তবে সব সময় একইভাবে মাথা নত করা হয় না। কাকে অভিবাদন জানানো হচ্ছে, পরিস্থিতি কী এবং কতটা সম্মান প্রকাশ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে প্রণামের ধরন। এর পেছনে রয়েছে জাপানের শত শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সামাজিক নিয়মকানুন।
ওজিগির শুরু কোথা থেকে?
জাপানে মাথা নত করে সম্মান জানানোর রীতির ইতিহাস নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এর একটি বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে যুক্ত।
ষষ্ঠ শতকে কোরিয়ার বেকজে রাজ্যের মাধ্যমে জাপানে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। প্রচলিত হিসাবে, ৫৩৮ অথবা ৫৫২ খ্রিস্টাব্দে জাপানে বৌদ্ধধর্মের আগমন ঘটে। ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে বুদ্ধের মূর্তির সামনে মাথা নত করা এবং গুরু বা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের রীতি জাপানি সমাজে পরিচিতি পায়। এভাবেই ধর্মীয় জীবনের অংশ হিসেবে ওজিগি জাপানি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকে।
তবে কিছু গবেষক মনে করেন, এই প্রথার আরও পুরোনো শিকড় রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইয়ায়োই যুগের কৃষিভিত্তিক ধর্মীয় আচারেও এমন ভঙ্গি ছিল।
পরে হেইয়ান যুগে অর্থাৎ ৭৯৪ থেকে ১১৮৫ সালের মধ্যে, দাঁড়িয়ে মাথা নত করা এবং বসে মাথা নত করার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। দাঁড়িয়ে করা প্রণামকে বলা হতো রিৎসুরেই, আর বসে করা প্রণামকে বলা হতো জারেই। আধুনিক জাপানি প্রণামের প্রাথমিক রূপ এখান থেকেই তৈরি হয়।
সামুরাইদের প্রভাব
কামাকুরা যুগে জাপানের সামুরাই বা যোদ্ধাশ্রেণি সমাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁদের জীবন ছিল নিয়ম-শৃঙ্খলার। সামুরাইদের মূল্যবোধের সঙ্গে জেন বৌদ্ধধর্মের শিক্ষারও সম্পর্ক ছিল। ফলে মানুষের আচার-আচরণ ও শিষ্টাচারের নিয়ম আরও কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। ওজিগি-ও তখন সামুরাইদের শিষ্টাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যায়।
মুরোমাচি যুগে (১৩৩৬–১৫৭৩) এসব নিয়ম লিখিতভাবে সংরক্ষণের চর্চা বাড়ে। ইসে ও ওগাসাওয়ারার মতো শিষ্টাচার ও আনুষ্ঠানিক আচরণের বিদ্যালয়গুলো কখন, কাকে এবং কীভাবে অভিবাদন জানাতে হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত নিয়ম তৈরি করে। মন্দিরে যাওয়ার সময় এক ধরনের প্রণাম, আবার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সময় অন্য ধরনের প্রণাম করা হতো।
এরপর জাপানে সেনগোকু যুগের অশান্ত সময় আসে। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তখন এসব নিয়মকানুনের চর্চা কিছুটা কমে যায়। পরে এদো যুগে জাপানে শান্তি ফিরে আসলে সামুরাইরা সমাজে আবার সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। তাঁদের শিষ্টাচারও ধীরে ধীরে সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় শহরের বিস্তার, শিল্প-সংস্কৃতির উন্নতি এবং চা-অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার কারণেও জাপানের শিষ্টাচারের নিয়মগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
জাপানে বিভিন্ন ধরনের ওজিগি
সবচেয়ে পরিচিত ধরনগুলোর একটি হলো এশাকু। এতে শরীর প্রায় ১৫ ডিগ্রি ঝোঁকানো হয়। সাধারণত সমবয়সী বা সমপর্যায়ের মানুষের মধ্যে দেখা হলে বা হালকা অভিবাদন জানানোর সময় এটি করা হয়। অনেকটা হাসিমুখে মাথা নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোর মতো, তবে এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকতারও ছোঁয়া থাকে।
আরেকটি অভিবাদন পদ্ধতি হলো কেইরেই। এতে শরীর প্রায় ৩০ ডিগ্রি ঝোঁকানো হয়। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসায়িক বৈঠক কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে এই ধরন ব্যবহার করা হয়। ধন্যবাদ জানানো বা আনুষ্ঠানিক অভিবাদনের সময়ও এটি দেখা যায়।
সাইকেইরেই-তে সাধারণত শরীর ৪৫ থেকে ৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঝোঁকানো হয় এবং কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখা হয়। ক্ষমা চাওয়া, খুব বেশি সম্মান দেখানো, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে আন্তরিক অনুশোচনা বা ধর্মীয় পরিবেশে বিশেষ শ্রদ্ধা প্রকাশের মতো পরিস্থিতিতে এটি করা হয়।
আরেকটি ধরন হলো সেনরেই। সাধারণত হাঁটু গেড়ে বসার সেইজা ভঙ্গি থেকে শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে এটি করা হয়। বসে থাকা অবস্থায় আনুষ্ঠানিক বা আধা-আনুষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে এটি ব্যবহার করা হয়।
দোগেজা: যখন মাথা নত হয় মাটির কাছাকাছি
ওজিগির মধ্যে দোগেজা হলো সবচেয়ে গভীর ধরনের প্রণাম। দোগেজা শব্দের অর্থ হলো মাটিতে বসা। এতে ব্যক্তি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নিচু করেন। মাথা এতটাই নিচু করা হয় যে কপাল প্রায় মাটির কাছাকাছি চলে আসে। এটি সাধারণ অভিবাদনের জন্য করা হয় না। আগে উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সামনে আনুগত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হতো। গুরুতর ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া কিংবা কারও কাছে বড় কোনো অনুগ্রহ প্রার্থনার সময়ও এই ভঙ্গি দেখা যায়। ইংরেজিতে একে সাধারণত প্রস্ট্রেশন বলা হয়।
দোগেজার ইতিহাসও অনেক পুরোনো। প্রাচীন চীনা গ্রন্থ গিশিওয়াজিনদেন-এ জাপানের ইয়ামাতাই রাজ্যের সাধারণ মানুষের অভিজাত ব্যক্তির সামনে মাটিতে নত হওয়ার বিবরণ রয়েছে। পরে কোফুন যুগের হানিওয়াতেও একই ধরনের হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করার ভঙ্গি দেখা যায়। এদো যুগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সামনে দোগেজা করতে হতো।
তবে আজকের জাপানে দোগেজা খুবই বিরল। এখন সাধারণত খুব গুরুতর পরিস্থিতিতে এটি করা হয়।
মাথা নত করে অভিবাদন কি শুধু জাপানের সংস্কৃতি?
বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতেই মাথা নত করে সম্মান জানানোর রীতি রয়েছে। ইউরোপের কিছু গির্জায় মানুষ শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য সামান্য মাথা নত করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে বয়োজ্যেষ্ঠদের পা ছুঁয়ে সম্মান জানানোর প্রচলনও রয়েছে। তবে জাপানের বিশেষত্ব হলো, মাথা নত করা সেখানে দৈনন্দিন সামাজিক জীবনেরই অংশ।
জাপানে মানুষ দেখা হলে, বিদায় নেওয়ার সময়, ধন্যবাদ জানাতে, ক্ষমা চাইতে কিংবা কোনো অনুরোধ করতে মাথা নত করেন। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক বৈঠক ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনেও এই রীতি দেখা যায়। এমনকি ফোনে কথা বলার সময়ও অনেক জাপানি অজান্তেই মাথা নত করেন, যদিও ওপাশের মানুষটি তাঁকে দেখতে পান না।
তথ্যসূত্র: সায়েন্স এবিসি