
মো: হাসান মুরাদ :
একের পর এক বাধায় এগোতেই পারছে না দেশের রাষ্ট্রীয় একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগার সম্প্রসারণ প্রকল্পটি। প্রায় ১৩ বছর নানান প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে গিয়েও ফের বাধার মুখে পড়েছে মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রকল্পের কাজ।
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট বা পিএমসি (প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক) নিয়োগের চলমান আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে আবারো দরপত্র আহ্বানের নির্দেশনা দিয়ে ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
অভিযোগ উঠেছে অননুমোদিত অবৈধ বেসরকারি রিফাইনারিকে বৈধ করতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় প্রকল্পটি ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর সরকারের দুর্বলতার সুযোগ খুঁজছে অনুমোদনবিহীন তৈরি হওয়া বেসরকারি রিফাইনারিগুলো।
গত ১৯ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পরিকল্পনা-৪ শাখার উপ-সচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক স্মারকে বলা হয়, ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলমান আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বাতিল করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণ করে নতুন করে রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (আরইওআই) আহ্বান করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
একই সঙ্গে পিএমসি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করার জন্যও বিপিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন পিএমসি নিয়োগের জন্য আগ্রহী আন্তর্জাতিক পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের শর্টলিস্ট তৈরি করেছিল বিপিসি। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫ অনুসরণ করেই এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে সর্বোচ্চ গুণগত বজায় রেখেই বাছাই করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে করে শুধু পিএমসি নিয়োগের জন্যে কমপক্ষে ছয় মাস পিছিয়ে গেল প্রকল্পটি।
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এর সক্ষমতা আর বাড়ানো যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে দেশে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে ২০১২ সালে ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্পটি হাতে নেয় বিপিসি। ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম ক্রুড পরিশোধন করার সুবিধা রয়েছে।
ইআরএল-২ প্রকল্পটির ব্যয় শুরুর দিকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও ২০১৬ সালে একাধিকবার সংশোধিত হয়ে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। টেকনিপ প্রকল্পটির ডিজাইন সম্পন্ন করে।
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর উপস্থিতিতে চুক্তি সই অনুষ্ঠান হয়। ওইদিন মন্ত্রী বলেন, পরবর্তী বছরের মধ্যেই ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরে বেশি সময় পেরুলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
তবে সময় গড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায়। আবারও সংশোধন করে ২০২২ সালের শেষের দিকে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারি জিওবি খাত থেকে ১৬ হাজার ১৪২ কোটি ৯৯ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অবশিষ্ট ৬ হাজার ৯১৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় মেটানোর কথা ছিল।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি আবারো সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ হিসেবে জিওবি ফান্ড থেকে ১৬ হাজার ৬৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ শতাংশ হিসেবে ৭ হাজার ১শ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অর্থায়নের একটি প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় জ্বালানি বিভাগ।
প্রকল্পটি অনুমোদনে অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে প্রকল্পটি পিপিপিতে নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে সমালোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলম। ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের একটি প্রস্তাবনা জমা দেয়। পরবর্তীসময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে ইআরএল-২ প্রকল্পটি আবারও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।
২০২৫ সালের ১১ আগস্ট মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ বিভাগে পাঠিয়েছে বিপিসি। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরে দুই দফায় কাটছাঁট করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে ঋণ হিসেবে ৬০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় হতে বহন করার কথা বলা হয়। ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন (জিও) দেয় সরকার। প্রকল্পটি বাণিজ্যিক অপারেশন শুরুর পর থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় উঠে আসবে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পিএমসি নিয়োগের জন্য গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। ২০ জুলাই এ দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। দরপত্রে বিভিন্ন দেশের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্রগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আট সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়।
বিপিসির টেকনিক্যাল কমিটি থাইল্যান্ডের ফোস্টার হুইলার (থাইল্যান্ড) লিমিটেড তুরস্কের বিইআরআর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসটিপি সৌদি টেকনোলজি প্রগেট্টি এসপিএ জেভি ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এসপিএ এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসএ সহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে শর্টলিস্ট করে প্রতিবেদন দেয়।
এর মধ্যে মূল্যায়ন অনুযায়ী আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসটিপি সৌদি টেকনোলজি প্রগেট্টি এসপিএ জেভি ও রাইনা কনসাল্টিং এসপিএ এক্সিলেন্ট বিইআরআর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ভেরি গুড এবং ফোস্টার হুইলার (থাইল্যান্ড) লিমিটেড ও ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসএকে গুড হিসেবে মূল্যায়ন করে বিপিসির টেকনিক্যাল কমিটি।
পিপিআর-২০২৫ এর আলোকে তৈরি করা আগ্রহপত্রের (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর একই কাজের একক বা যৌথভাবে অন্তত ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পে প্রতিদিন ন্যূনতম ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত তিনটি পরিশোধনাগার প্রকল্পে ‘পিএমসি’ হিসেবে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
আলোর মুখ দেখছে ইস্টার্ন রিফাইনারির ২য় ইউনিট, খরচ ২৩ হাজার কোটি এই তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি নিজ দেশের বাইরে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলা হয়। আর্থিক ও ব্যবস্থাপকীয় সামর্থ্য থাকবে। এ ধরনের কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জনবল এবং কোম্পানির সুযোগ-সুবিধা ও দক্ষতার তথ্য সম্বলিত ব্রুশিয়ার থাকতে হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, পিএমসি দরপত্রে ২৩টি আবেদন পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটিকে শর্টলিস্টে আনা হয়েছে। পিএমসি নিয়োগের জন্য পিপিআর-২০২৫-এ পাঁচটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সবাই সবগুলো শর্ত পূরণ করেছে। তারা সবাই বিশ্বের নামিদামি প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্পে পিএমসি নিয়োগের দরপত্রটি এ পর্যায়ে কেন বাতিল করা হয়েছে, তার সদুত্তর দেননি কেউ। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছেন আমাদের প্রতিবেদক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পিএমসির চলমান দরপত্র বাতিল করে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী নতুন দরপত্র ডাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইওআই (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) এবং টিওআর (টার্মস অব রেফারেন্স) পুনরায় মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ এই ‘ইওআই’ ও ‘টআর যারা করেছে, তাদের মধ্যে একজন বুয়েটের প্রফেসর, একজন পেট্রোবাংলার পরিচালকও ছিলেন। তিনিও প্রকৌশলী। সঙ্গে বিপিসি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির অভিজ্ঞদের নিয়ে ‘ইওআই’ ও ‘টিওআর’ তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫ এর প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পর্যালোচনা করেই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করেছে টেকনিক্যাল কমিটি। বিপিসির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ওই কমিটিতে বুয়েট, শিপিং করপোরেশন, বিপিসি, ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকৌশলী ও টেকনিক্যাল লোকেরাই যুক্ত ছিলেন। এখন নতুন করে দরপত্র করে পুরো কার্যক্রম শেষ করতেই ছয় মাস লেগে যাবে।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, পিএমসি নিয়োগের বিদ্যমান দরপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হন। বিষয়টি অস্বীকার না করে এক কর্মকর্তা বলেন, দরপত্রটি অনুমোদনের বিষয়ে আমরা কনফিডেন্ট (আত্মবিশ্বাসী) ছিলাম।
এর মধ্যে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে দরপত্র বাতিলের নির্দেশনা দেওয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে চিঠি স্বাক্ষরকারী জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, কীভাবে সিদ্ধান্তটি হয়েছে আমি জানি না। আমি দেশের বাইরে ছিলাম। গতকাল (সোমবার) এসেছি। ডেস্ক অফিসার হিসেবে চিঠিতে সাইন করেছি। আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণকারী পাওয়ার জন্যেই সম্ভবত দরপত্রটি বাতিল করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আরও বেশি অভিজ্ঞ অংশগ্রহণকারী পাওয়া যাবে। আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে। বিদ্যমান আগ্রহী যারা ছিলেন, তারাও ওই দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন।
তবে প্রকল্প পরিচালক (সরকারের যুগ্ম সচিব) আসমা আরা বেগম বলেন, আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণকারী পাওয়ার জন্যই সম্ভবত দরপত্রটি বাতিল করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আরও বেশি অভিজ্ঞ অংশগ্রহণকারী পাওয়া যাবে। আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে। বিদ্যমান আগ্রহী যারা ছিলেন, তারাও ওই দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন।
তবে নতুন প্রক্রিয়ায় ছয় মাস সময় লাগবে না দাবি করে তিনি বলেন, প্রথম দরপত্র ডাকার পর অংশগ্রহণের জন্য ৪২ দিন সময় দিতে হয়েছিল। এবার ২১ দিন সময় দিতে হবে। এতে পিএমসি নিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়াটি শেষ করতে হয়তো তিন মাস লাগতে পারে। এতে পুরো প্রকল্পে তার প্রভাব পড়বে না। কারণ প্রকল্পের অন্য কার্যক্রম চলমান। পিএমসি নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় দরপত্র করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশাকরি বিষয়টি প্রকল্পের সামগ্রিক কাজে প্রভাব ফেলবে না।
এই বিষয়ে বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, পিএমসি নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় দরপত্র করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি বিষয়টি প্রকল্পের সামগ্রিক কাজে প্রভাব ফেলবে না।
বিশেষজ্ঞ ও সমালোচকরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন প্রকল্পের পিএমসি নিয়োগের দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত কালক্ষেপণ করার শামিল। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে বেসরকারি রিফাইনারি কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো সুযোগ নেবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, পিএমসির জন্য পুরো প্রকল্পের ২ শতাংশও ব্যয় হয় না। আর পিএমসি নিয়োগের দরপত্র বাতিল করার সিদ্ধান্ত শুধু কালক্ষেপণ করা ছাড়া কিছুই নয়। আমি যতটুকু জানি, যারা এ প্রকল্পের পিএমসি হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, তাদের অনেকে বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কি একজনকেও যোগ্য পাওয়া গেল না?
তিনি বলেন, ইআরএল-২ প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নে একদিন বিলম্বিত হলে কত টাকা ক্ষতি, আর একদিন আগে হলে কত লাভ? সেই হিসাব মন্ত্রণালয়ের করা উচিত।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সংগঠক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জ্বালানি নিয়ে পুরো দেশ যে সংকটের মধ্যে আছে, তাতে দ্রুততম সময়ে রাষ্ট্রীয় খাত আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার বেসরকারি খাত ও বিশেষ গোষ্ঠীকে ব্যবসা দেওয়ার জন্য বেশি তৎপর।
তিনি বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পে পিএমসি নিয়োগের দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে বোঝা যাচ্ছে, বেসরকারি খাত ও বিশেষ গোষ্ঠীকে স্বার্থ দেওয়ার পথটি আরও উন্মুক্ত হবে। এ ধরনের পথ থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে বলে আমি মনে করি।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডির পর ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপকে দিয়ে ফিড (ফ্রন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন) তৈরি করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা যাবে এবং দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫-৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ক্রুড অয়েল ব্লেন্ডিং সুবিধা থাকায় জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যারেলপ্রতি ১৮-১৯ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।