
মো: হাসান মুরাদ :
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলার পুরোটা কার্যকর করেনি সরকার। মে মাসে ফর্মুলায় ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ২৩৫ টাকা নির্ধারিত হলেও ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১১৫ টাকা। এতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বড় চাপ থেকে ভোক্তা কিছুটা স্বস্তি পেলেও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বিপিসি। সংস্থাটি গত ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে বিস্তারিত কার্যপত্র উপস্থাপন করে। বৈঠকে বিভিন্ন সময় পেট্রোলিয়ামের মূল্য বৃদ্ধির কারণ ও সমাধানের উপায় সংক্রান্ত ও পেট্রোলিয়ামের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল পিএলসির ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়।
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বড় উদাহরণ মে মাসের ডিজেল। ওই মাসে স্বয়ংক্রিয় প্রাইসিং ফর্মুলায় ডিজেলের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল লিটার প্রতি ২৩৫ টাকা। অথচ দেশের বাজারে তখন ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। অর্থাৎ দুই দামের মধ্যে ব্যবধান ছিল ১২০ টাকা। তবে এই ১২০ টাকা সরাসরি বিপিসির লিটার প্রতি লোকসান নয়। কারণ স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলার মূল্যের সঙ্গে আমদানি ব্যয়, কর, পরিবহন, বিপিসির মার্জিনসহ বিভিন্ন উপাদান যুক্ত থাকে। কিন্তু এই ব্যবধান একটি বিষয় স্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তার কাছে সমন্বয় করা হয়নি। এর আর্থিক চাপের বড় অংশ পড়েছে বিপিসির ওপর। বিপিসির সরকারি কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট এই ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
স্বয়ংক্রিয় প্রাইসিং ফর্মুলা কোনো অনুমানভিত্তিক হিসাব নয়, এটি সরকারের জারি করা জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকায় নির্ধারিত সরকারি মূল্য হিসাবের কাঠামো। আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক-কর, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এই ফর্মুলায় একটি সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ফর্মুলায় পাওয়া দামই চূড়ান্ত খুচরা মূল্য এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার মূল্য বা বিপিসির মার্জিন সমন্বয় করতে পারে।
বিপিসির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলায় পাওয়া দাম ও কার্যকর বাজার দামের মধ্যে বড় ব্যবধান ছিল। এপ্রিলের শুরুতে ডিজেলের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ১৫৬ টাকা, অথচ কার্যকর মূল্য ছিল ১০০ টাকা। মে মাসে প্রস্তাবিত মূল্য ২৩৫ টাকা হলেও কার্যকর ছিল ১১৫ টাকা। জুনে ১৭৬ টাকার বিপরীতে ১১৫ টাকা, জুলাইয়ে ১৫৪ টাকার বিপরীতে ১১৫ টাকা এবং আগস্টে ১৪৭ টাকার বিপরীতে ১১৫ টাকা কার্যকর ছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফর্মুলায় ডিজেলের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ১৮৭ টাকা। তখনও কার্যকর বাজারদর ছিল ১১৫ টাকা। তবে ২১ সেপ্টেম্বর সরকার মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে ১৩৫ টাকা করে ডিজেলের দাম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয়ের সঙ্গে দেশের বাজারের দাম সামঞ্জস্য করার যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, সংকটের সময়ে সেটির হিসাব এবং কার্যকর মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
অন্যদিকে, এপ্রিলে একইভাবে অকটেনের প্রস্তাবিত মূল্য ১৪৯ টাকা হলেও কার্যকর ছিল ১২০ টাকা, পেট্রোলের প্রস্তাবিত মূল্য ১৪৫ টাকা হলেও কার্যকর ছিল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিনে ১৪১ টাকা প্রস্তাবিত হলেও ১৩০ টাকা করা হয়। এরপরও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির তুলনায় স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলার প্রস্তাবিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদামের অনুযায়ী ডিজেলের প্রস্তাবিত মূল্য ছিল ১৭৬ টাকা, অকটেন ১৬১, পেট্রোল ১৫৭ এবং কেরোসিন ১৫৩ টাকা। বাস্তবে কার্যকর ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৪৫, ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়। মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিপিসির বড় লোকসান ভোক্তা পর্যায়ে পরিবহন ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়।
অন্যদিকে দাম না বাড়ালে বিপিসির লোকসান বাড় প্রস্তাব হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রভাব সামলাতে ফুয়েল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড বা জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহায়ে যে মূল্য কার্যকর হয়, সেটি নির্ধারণের মূল আর্থিক ঝুঁকি বিপিসির ওপরই থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে এবং দেশের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি পর্যায়ের করও জ্বালানি তেলের প্রকৃত ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে শুধু খুচরা মূল্য সমন্বয় করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, কর কাঠামো, পরিশোধন সক্ষমতা, পরিবহন ও সর, অন্যদিকে মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহবিল, শুল্ক-কর কাঠামোর পুনর্বিবেচনা, রিফাইনারি আধুনিকায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমানোর মতো নেই।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে শুরু করে ডলারের বিনিময় হার, আমদানি পর্যায়ের কর, দেশের খুচরা মূল্য নির্ধারণ এবং বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা প্রতিটি স্তরের যোগফলেই তৈরি হয়েছে বর্তমান ঘাটতি। সেই ঘাটতি সামলাতে সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধি একটি তাৎক্ষণিক সমন্বয় হলেও, সরকারি নথিতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারের বড় ধরনের নির্ধারিত হারেই রাখা হয়েছে।
এই ব্যবধানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বিপিসির তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ডিজেলের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য ছিল ব্যারেল প্রতি ৮৬ ডলার। মার্চে সেই গড় মূল্য এক লাফে দাঁড়ায় ১৮৬ দশমিক ৫৯ ডলার। এপ্রিলে গড় মূল্য ছিল ১৮৭ দশমিক ৯০ ডলার। এপ্রিলে সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলার পর্যন্ত। মে মাসে গড় দাম কমে ১৪৯ দশমিক ৪৯ ডলারে এলেও তা ফেব্রুয়ারির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। আগস্টে গড় মূল্য ছিল ১৪৮ দশমিক ৮৫ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলার। ফলে মে মাসে ফর্মুলায় ডিজেলের দাম ২৩৫ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মার্চ-এপ্রিলের বড় ধাক্কার প্রভাব ছিল।
বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডলারের বিনিময় হার। বিপিসির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে এক ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৬ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় ডলারের দাম বাড়লে একই পরিমাণ তেল কিনতে বাংলাদেশি মুদ্রায় বেশি টাকা লাগে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারের বিনিময় হার এক টাকা বাড়লে ডিজেলের লিটারপ্রতি ব্যয় প্রায় ১ টাকা ৪৫ পয়সা বৃদ্ধি পায়। নথিতে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ডিজেলের লিটারপ্রতি প্রায় ৫৫ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপের হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে সংকটটি শুধু তেলের দাম কত এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। তেল কেনার সময় এক ডলারের দাম কত সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয়ের আরেকটি উপাদান শুল্ক-কর। বিপিসির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ট্যারিফ ভ্যালুর পরিবর্তে ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক-কর পরিশোধ করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি মূল্য বাড়ে এবং সেই সঙ্গে শুল্ক-করও বাড়তে পারে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের ক্ষেত্রে মোট শুল্ক-কর ফেব্রুয়ারিতে ছিল লিটারপ্রতি ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা। মার্চে তা বেড়ে ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা এবং এপ্রিলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছে। এরপর পরবর্তী মাসগুলোতে শুল্ক-কর কমে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে তা ছিল ৩৫ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সময় বিপিসির ক্রয় ব্যয় যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে করের চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিপিসির কার্যপত্রে সাময়িকভাবে ইনভয়েস ভ্যালুভিত্তিক শুল্ক-কর কমানো অথবা ট্যারিফ ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক-কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত গত ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পরও আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো ব্যয় ভোক্তার ওপর দেওয়া হয়নি। বিপিসি’র সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করলে ডিজেলের দাম প্রায় ২০৫ টাকা হতে পারত। বাস্তবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। ফলে মে মাসের ২৩৫ টাকা এবং সেপ্টেম্বরের ১৩৫ টাকা দুটি ভিন্ন সময়ের দুটি ভিন্ন হিসাব হলেও, দুটো সংখ্যাই একই বাস্তবতা সামনে আনে, আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয়ের পুরোটা দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দামে প্রতিফলিত হয়নি।
সরকারি কার্যপত্রে বিপিসির আর্থিক চাপ সামলাতে একাধিক কাঠামোগত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় জনগণকে সহনীয় মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপিসিকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেওয়া। পাশাপাশি সাময়িকভাবে ইনভয়েস ভ্যালুতে শুল্ক-কর কমানো অথবা আগের মতো ট্যারিফ ভ্যালুর ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে। আরেকটি প্রস্তাব হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রভাব সামলাতে ‘ফুয়েল স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ বা জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহবিল গঠন। এর উদ্দেশ্য হবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে পুরো চাপ একবারে দেশের বাজারে না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে তা সামাল দেওয়া। বিপিসির অবকাঠামোগত ব্যয় কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এতে দেশে উৎপাদিত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের অংশ বাড়লে আমদানি নির্ভরতার কিছুটা চাপ কমতে পারে বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় অটোমেশন চালু করে সাপ্লাই চেইনের সিস্টেম লস কমানো এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে মাদার ভেসেল থেকে সরাসরি তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় দেশের তিন রাষ্ট্রীয় বিপণন কোম্পানি পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকারি কার্যপত্রে বলা হয়েছে, মূল্য নির্ধারণে তাদের সরাসরি ভূমিকা নেই। বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী এসব কোম্পানি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল বিপণন, সরবরাহ, পরিবহন ও মজুদের কাজ করে। জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়া বা কমার কারণে যে লাভ-লোকসান তৈরি হয়, সেটি বিপিসিই বহন করে। বিপণন কোম্পানিগুলো নির্ধারিত হারে মার্জিন পেয়ে থাকে। অর্থাৎ পাম্প পর্যায়ে যে মূল্য কার্যকর হয়, সেটি নির্ধারণের মূল আর্থিক ঝুঁকি বিপিসির ওপরই থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে এবং দেশের বাজারে দাম একই রাখা হলে বিপণন কোম্পানির পরিবর্তে মূল আর্থিক চাপ পড়ে বিপিসির ওপর।
ভোক্তার জন্য দাম তুলনামূলক কম রাখলে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় কাউকে না কাউকে বহন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই চাপের বড় অংশ পড়েছে বিপিসির ওপর। সংস্থাটির কার্যপত্র অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। একই নথিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপিসির কাছে দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু হিসাবের খাতায় লোকসান নয়; জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার, ফ্রেইট, শুল্ক-কর এবং বিপিসির আর্থিক সক্ষমতার সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মে মাসের ২৩৫ টাকা বনাম ১১৫ টাকা তাই শুধু দুটি দামের তুলনা নয়। এটি দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের হিসাব এবং দেশের ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে কতটা ব্যবধান তৈরি হতে পারে।