

কে এম রাজীব :
চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীদের সাথে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতে চেচামেচি আর উচ্চ স্বরে কথা বলার অবসান ঘটিয়ে মানবিক উদ্যােগ নিয়ে নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম " স্বজন " এর উদ্বোধন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ) সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের আগ্রহেই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আনুষ্ঠানিক ভাবে সেবাটি উদ্বোধন করেন
ওয়ান-টু-ওয়ান ইন্টারকম টেলিফোন " স্বজন " এর ফলে এখন থেকে গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আর চিৎকার করে কথা বলতে হবেনা স্বজনদের। এতদিন কারাগারে বন্দীদের সাথে গ্রিলের এপাশে মা, ওপাশে ছেলে মাঝখানে লোহার ফাঁক আর অসহনীয় শব্দ। কে কী বলছে বোঝা যেত না। চিৎকার, কান পেতে শোনা, আর অপূর্ণ থেকে যাওয়া অসংখ্য কথা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। নতুন ব্যবস্থায় সেই দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হলো। কারা সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এটি একটি ব্যতিক্রম ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের কারাগার গুলোতে ইন্টারকম চালুর এটি দ্বিতীয় উদ্যোগ হলেও, একসঙ্গে ৩২টি বুথ স্থাপন এত বড় পরিসরে প্রথমবার বাস্তবায়িত হলো চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।
খুলশী থানাধীন আমবাগান এলাকার হত্যা মামলায় এক বছর ধরে কারা ভোগ করছিলেন দেলোয়ার হোসেন বাবুল নামের এক হাজতি। তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার, ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা। সাক্ষাৎ শেষে বাবুলের বন্ধু মো. সাইফুল হোসেন বলেন,
আগে কিছুই বুঝতাম না। আমরা কী বলছি, ভেতর থেকে কী বলছে সব শব্দের মধ্যে হারিয়ে যেত। আজ ইন্টারকমে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বললাম। এসময় চোখ ভেজা কণ্ঠে রুমা আক্তার বলেন, ছেলেটা আজ বাবার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পেরেছে। এইটুকুই আমাদের জন্য অনেক। রাজনৈতিক মামলায় বন্দী হালিশহরের মো. শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে এসে তাঁর ভাই মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, এতদিন গলা ফাটিয়ে কথা বলতে হতো। আজ শান্তিতে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। তিনি জানান, বর্তমানে এই কারাগারে ৬ হাজার ৪৫৫ জন বন্দী রয়েছেন। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক স্বজন সাক্ষাতে আসেন। ভিড় ও শব্দের কারণে এতদিন অনেকেই ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না।
এসময় জেলা প্রশাসক বলেন, আমি নিজেও কথা বলে দেখেছি একটি ছোট শিশু তার বাবার সঙ্গে কথা বলছে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আদালত করবে। কিন্তু বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা তো অপরাধী নন। কারাগারে অবস্থানকালে আমরা যতটুকু সম্ভব মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। কারা অধিদপ্তরের অনুমোদনে আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে নিচতলায় দুই পাশে ১৬টি করে মোট ৩২টি ইন্টারকম স্থাপন করা হয়েছে এর মধ্যে ১২টি পুরুষ ও ৪টি মহিলা বন্দীদের জন্য বরাদ্দ। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তলাতেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন,“প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে একসময় হয়তো অনলাইনে সাক্ষাৎ বা ভিডিও কলে দেখেও কথা বলার ব্যবস্থা হবে।
কারাগার মানেই শুধু শাস্তির পরিসর নয় মানবিক ব্যবস্থাপনারও একটি ক্ষেত্র। গ্রিলের দুই পাশে আজ যারা স্বচ্ছ কণ্ঠে কথা বললেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে—প্রশাসনের একটি মানবিক সিদ্ধান্ত কখনও কখনও অনেক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। এসময় সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন,“এখন আর চিৎকার করে কথা বলতে হবে না। সারাদেশের কারাগারের মধ্যে চট্টগ্রাম কারাগারেই প্রথম এত বড় পরিসরে এই ব্যবস্থা চালু হলো।