
স্টাফ রিপোর্টার:
দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের বরাদ্দ নেওয়া প্রায় সাত একর (৩০ হাজার বর্গমিটার) জমির ভাড়া পরিশোধ করেনি সাইফ পাওয়ারটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই-ইঞ্জিনিয়ারিং। পতেঙ্গা এলাকার এই জায়গার বিপরীতে ভাড়া ও ভ্যাট মিলিয়ে বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। একাধিক নোটিশের পরও টাকা আদায় না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মামলা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ই-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আবেদনের ভিত্তিতে পতেঙ্গা ১৫ নম্বর খালের পাশে খোলা জায়গাটি অস্থায়ীভাবে ছয় মাসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। তখন সেখানে বেশ কিছু নির্মাণকাজ চলছিল। নির্মাণসামগ্রী ও মালামাল রাখার সুবিধার্থে স্পেস রেন্টের ভিত্তিতে জমিটি দেওয়া হয়।
জমির দখল বুঝে নেওয়ার পর ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত নিয়মিত ভাড়া ও ভ্যাট পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর শুরু হয় অনিয়ম। ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি। এই ছয় বছরে মাত্র ছয় মাসের ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বকেয়া আদায়ে তারা ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেয়। ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর প্রথম নোটিশ পাঠানো হয়। সাড়া না পেয়ে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ দ্বিতীয়বার এবং ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৃতীয়বার চিঠি দেওয়া হয়। প্রতিবারই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ই-ইঞ্জিনিয়ারিং।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ বন্দরের বোর্ড সভায় জমির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া না দেওয়া গুরুতর অনিয়ম। সভায় বকেয়া আদায়ে মামলা করার বিষয়েও একমত হয় কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের ৩০ জুলাই পাঠানো লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, ৪ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা বকেয়া ভাড়া ও ভ্যাট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে বরাদ্দ বাতিল হওয়া জমির দখল বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এতেও কোনো সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ চলতি বছরের গোড়ার দিকে আদালতে মামলা করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী ব্যবস্থাপক (এস্টেট-২) মো. রায়হান উদ্দিন বলেন, সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নোটিশ ও আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ফল না পাওয়ায় আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।
ই-ইঞ্জিনিয়ারিং হলো সাইফ পাওয়ারটেকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সাইফ পাওয়ারটেক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তারা ১৭ বছর ধরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল এবং ঢাকার কমলাপুর আইসিডি পরিচালনা করছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজেও ঠিকাদার হিসেবে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।
এ বিষয়ে জানতে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকেছিল কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত যন্ত্রপাতি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সেই প্রতিষ্ঠানটিই এক সময় বন্দরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলো। একে একে বাগিয়ে নিয়েছিলো সিসিটি এবং এনসিটির টার্মিনাল পরিচালনার কাজ। প্রতিষ্ঠানটিকে এখন অনেকে বন্দরের সুপার পাওয়ার হিসেবেও অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বন্দরে টার্মিনাল অপারেটররা নিজেদের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এমন নিয়ম নেই। সেই সুবাদে বন্দরের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সাইফ পাওয়ারটেক। অর্থাৎ পুঁজি বন্দর কর্তৃপক্ষের, আর মধুর ভাগ সাইফের। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন। দেশের অন্য বন্দরগুলোতেও রয়েছে তার প্রভাব। এ ছাড়া বিদেশে ব্যবসার নামে অর্থ পাচার, নন বাইন্ডিং চুক্তির ছদ্মাবরণে শেয়ারের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো নানা অভিযোগও উঠেছে তার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকেছিল কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত যন্ত্রপাতি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সেই প্রতিষ্ঠানটিই এখন বন্দরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একে একে বাগিয়ে নিয়েছে সিসিটি এবং এনসিটির টার্মিনাল পরিচালনার কাজ। প্রতিষ্ঠানটিকে এখন অনেকে বন্দরের সুপার পাওয়ার হিসেবেও অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বন্দরে টার্মিনাল অপারেটররা নিজেদের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এমন নিয়ম নেই। সেই সুবাদে বন্দরের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সাইফ পাওয়ারটেক। অর্থাৎ পুঁজি বন্দর কর্তৃপক্ষের, আর মধুর ভাগ সাইফের। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন। দেশের অন্য বন্দরগুলোতেও রয়েছে তার প্রভাব। এ ছাড়া বিদেশে ব্যবসার নামে অর্থ পাচার, নন বাইন্ডিং চুক্তির ছদ্মাবরণে শেয়ারের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো নানা অভিযোগও উঠেছে তার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

২০০৬ সালের আগে জাপানের সুমিতমো করপোরেশনের কাছ থেকে চারটি রেল মাউটেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহ করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। মাউটেন্ট কী গ্যান্ট্রি ক্রেন পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের স্থানীয় এজেন্ট ছিল সাইফ পাওয়ারটেক। এর মধ্য দিয়েই সাইফ পাওয়ারটেকের মধু খাওয়া শুরু। অবশ্য, মধুর ভাগ খাওয়ার আগে বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১২টি শর্ত পরিবর্তন করিয়ে আইনি বাধা অতিক্রম করেছে তারা নিজেদের ‘ক্ষমতা’ কাজে লাগিয়ে। সিসিটি পরিচালনায় বন্দরের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সাইফ পাওয়ারটেককে বিশেষ সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজদের আইন পরিবর্তন করেছিল!
শুধু কি তাই, ২০০৬ সালে বন্দরের মাত্র ১৫০ টাকা হারে টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজের জন্য দরপত্র দাখিল করে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সর্বনিম্ন দরদাতা এই প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ না পেলেও উচ্চমূল্যে কাজটি বাগিয়ে নেয় সাইফ পাওয়ারটেক। এরপর প্রতি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চার্জ নেওয়া হয়েছিলো ৯০০ টাকা হারে। সাইফ পাওয়ারটেকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে ২ কোটি ১০ হাজার ৭৩৯ টিইইউএস। কয়েক বছর আগে এই হার ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে চার্জ কমাতে বাধ্য হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তারপরও চার্জ অনুযায়ী ১৭ বছরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে প্রতি টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বাড়তি নেওয়া হয়েছে ৭৫০ টাকা হারে। সেই হিসাবে শুধু কন্টেইনার হ্যান্ডলিং থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বাড়তি আয় করেছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।
























