
অনিন্দিতা চৌধুরী:
ক্যাসেটের ফিতায় বেজে চলা সেই সুরেলা গান—’চিঠি দিও প্রতিদিন’, এখন বোধহয় একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয় আমাদের রোজকার জীবনে। কিন্তু মনে করুন, পুরনো গান, উপন্যাস, সিনেমায় চিঠি কত জাগরিক হয়ে ছিল সবসময়। বিরহের প্রতীক—প্রেয়সীর একটি চিঠি, হয়তোবা বিদায়ের শেষ কথাটি আঙুলের মিহি বুননে তুলে দেওয়া প্রেমটুকু।
চিঠির সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবেই জুড়ে আছে ডাক বিভাগের নাম। এ উপনিবেশে শের শাহের আমলে চল শুরু হয় ডাক ব্যবস্থার। তখন ডাক বয়ে আনতো ঘোড়ারা। এরপর জাহাঙ্গীরের সময়ে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে প্রশিক্ষিত পায়রার পায়ে বেঁধে বিভিন্ন ঘরানার চিঠি প্রেরণের প্রচলন ছিল। সময়ের পরিক্রমায় পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়, সেইসঙ্গে আরও এগিয়ে যায় ডাক ব্যবস্থাও। ঘোড়া, পায়রা কিংবা অন্য মাধ্যমের পর মানুষকে কাজে লাগানো হয়।
পাঠ্যবইয়ের গল্পে পড়া দীনু নামের সেই দীনহীন ডাক হরকরার কথা মনে আছে তো? কিংবা সুকান্তের কবিতায় রাতভর ছুটে চলা রানার? বিভিন্ন সময়ে ডাক বিভাগেরই কর্মচারী ছিলেন তারা। তাদের সেই ঝুলিভর্তি চিঠিতে কখনো বয়ে আনতো বিষাদের সংবাদ কিংবা আনন্দের ‘সন্দেশ’।
সেই ২০০০ সালের দিকের কথা। মায়ের চাকরির সুবাদে আমরা একটি গ্রামে থাকি। আত্মীয়স্বজনরা সকলেই দুয়েক জেলা পরে পরে বসতি গড়ে থাকছেন। কোনো কোনো সকাল একটু বেশি ফুরফুরে হতো চিঠি আসার আনন্দে। আয়তাকার হলুদ খাম, সবুজ পোস্টকোড লেখার নাম আর ডাক বিভাগের ছাপ। খুব প্রতিসমভাবেই একদিকে প্রেরক, আর অন্যদিকে প্রাপকের নাম। প্রাপকের নাম হিসেবে মায়ের নামটাই বেশি থাকত। ও দেখে খুব ইচ্ছে হতো, এমন একটা খামে করে যদি কখনো আমার জন্য চিঠি আসে! সে ইচ্ছে কখনো একইভাবে পূরণ না হলেও ওই খামগুলোতে অনেকেই আমাকে উদ্দেশ করে ছোট দুয়েকটা চিঠি দিতেন। তা দেখে আমার দায়িত্ব অনেকখানি বেড়ে যেত। গুটি গুটি অক্ষরে, আমার স্টিকার সাঁটানো ডায়েরির পাতায় খুব যত্ন করে তুলে দিতাম নিজের গুরুত্বপূর্ণ সব খবর-সবর।
‘প্রিয় দাদু, আমার প্রণাম নিও। আশা করি ভালো আছ।’
বেশিরভাগ সময়েই চিঠির আদলটা এমন হতো। সেই চিঠি খাম পর্যন্ত নিয়ে, ডাকটিকিট সাঁটিয়ে তারপর চিঠির বাক্সে ফেলা পর্যন্ত এ এক মন দুরুদুরু অবস্থা। সেই নিস্তরঙ্গ কিন্তু মিষ্টি এক জীবন—এও ছিল এক অ্যাডভেঞ্চার। কী করে সে চিঠি এখানকার বাক্স থেকে অন্য জায়গায় যাবে, ঠিক কীভাবে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে ঠিক মানুষটি আমার লেখা শব্দগুলো পড়বে—ভেবে আমার ভীষণ অবাক লাগতো। সেই আমি এখন বসে ‘রিয়েল-টাইম’ টেক্সটিং বা কলিংয়ে অভ্যস্ত, তা ভেবে প্রহসনের মতোই লাগে। কে জানে, অবাক হবার অভ্যাস কি ক্ষয়ে গেছে নাকি।
আমার মায়ের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাটি আরও ভিন্ন। চা বাগানের বাসিন্দা একটি মেয়ে যখন পড়াশোনা ও কাজের জন্য ঢাকা শহরে বসবাস করে, সময়টা তখন ষাট-সত্তরের দশক। বাড়ির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের তখন একটিই মাধ্যম ছিল। পোস্টাল কোডে পাঠানো চিঠি। দায়িত্বের কথা, কুশলের আলাপ, ভবিষ্যত পরিকল্পনা—আশা, হতাশায় ভরপুর হলদেটে কাগজে ভর্তি চিঠিগুলোয় যেন সব কথাই ঠেসেঠুসে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা থাকত। কেননা ফোন তো আর নয়, যে কথাটা না বললে আরেকবার রিং করা যাবে! মায়ের তরুণীকালের একটি চিঠি আমাদের বোনদের হাতে পড়েছিল, তা আজও আছে। মাঝে মাঝে সময়ের কাঁটা পেছনে ফেরাতে ওখানা খুলে দেখা হয়।
চিঠি আদান-প্রদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেলেও, বর্তমানে আমাদের ডাক বিভাগ যে অচল, তা নয়। বেশ ভালোরকমই সচল। কিন্তু যোগাযোগের মাধ্যম অনেক গতিশীল হয়ে যাওয়ায় ওই অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। আর প্রয়োজন ছাড়া জীবনে খুব কম কাজই লোকে করতে চায় বলেই হয়তো ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদানটা আর রাস্তার পাশে থাকা লাল রঙের সেই ডাকবাক্সের মুখাপেক্ষী হয়ে নেই। ওখানা বেশিরভাগ সময় ছোটখাটো শো-পিস হিসেবে উপহার দেওয়া-নেওয়া বা ঘরে সাজিয়ে রাখাতেই সীমাবদ্ধ।
এ ছাড়া অবশ্য সরকারি কিছু দাপ্তরিক চিঠি আদান-প্রদানের জন্য এখনো ডাকবিভাগকেই সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়। ডাক বিভাগের বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার স্ফূরণের ফলে ডাক বিভাগ এখনো বেশ প্রাসঙ্গিক।
ডাক বিভাগ বা এর আনুষঙ্গিক বিষয়াদি যে আমাদেরকে শুধু একসময়ের যোগাযোগের অভ্যাস মনে করিয়ে দেয়, তা নয়। সংগ্রাহকদের কাছে অন্যরকম আবেদন আছে ডাকটিকিটেরও। বিভিন্ন সময়ে স্মারক ডাকটিকিট ছাড়া হয়। সেগুলোর ডিজাইনে থাকে দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা, ব্যক্তি, সময় ইত্যাদি বিষয়াদি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ডাকটিকিট সংগ্রহের চর্চা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ফিলাটেলিক সোসাইটির মতো সংগঠনগুলো নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। ডাক বিভাগের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ৭৩২ ধরনের ডাকটিকিট বের করেছে।
হারিয়ে যায়নি আজও লাল চিঠির বাক্সেরাও। কেউ চাইলে ছোটবেলার স্মৃতি কুড়িয়ে পেতে চাইলে একবার টুপ করে তাতে ফেলে দিতেই পারেন একখানা হলুদ খাম, আর সঙ্গে মনের কথায় ভরপুর একটি চিঠি। উত্তরের জন্য কিন্তু অপেক্ষা করতে হবে অনেকখানি।
























