

বাবর মুনাফ, বোয়ালখালী প্রতিনিধি:
ননাইয়ারমার ঘাট— চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার এক অবহেলিত ও বঞ্চিত জনপদ। পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের (প্রস্তাবিত চরখিজিরপুর ইউনিয়ন) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের এ জনপদটি জন্মলগ্ন থেকেই বোয়ালখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রায় দুই শ বছর আগে ননাইয়ারমার ঘাট নামে এ জনপদের গোড়াপত্তন হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগসহ মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা।
পটিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী হাবিলাসদ্বীপ ও কোলাগাঁও ইউনিয়নের পাশে অবস্থিত ননাইয়ারমার ঘাট কর্ণফুলীর প্রবাহমান বোয়ালখালী খালের তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা সবুজ-শ্যামল জনবসতি। চলাফেরা, বাজার-সওদা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখানকার মানুষজন পটিয়ার ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রশাসনিকভাবে তারা বোয়ালখালীর বাসিন্দা।
এ জনপদে ১৩৫টি পরিবারের বসবাস। ভোটার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। ভোট দেন বোয়ালখালীতে, প্রশাসনিক সেবাও নিতে হয় বোয়ালখালী থেকেই। তবে এপার-ওপার যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। কর্ণফুলী নদী, বোয়ালখালী খাল, দু’মুখো খাল ও পটিয়ার গরুলুটা খালবেষ্টিত এ জনপদটি পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমল থেকেই ননাইয়ারমার ঘাটের নৌকাই এখানকার মানুষের প্রধান পারাপারের মাধ্যম।

এলাকায় রয়েছে সরু একটি চলাচলের রাস্তা। ভাঙাচোরা ইটের এই সড়কের অপর প্রান্তে পটিয়ার গরুলুটা খাল। ওই খালের ওপর নির্মিত একটি কালভার্ট পটিয়ার সঙ্গে ননাইয়ারমার ঘাটকে যুক্ত করেছিল। তবে ভাঙনে সেটি বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোলাইমান বলেন, বোয়ালখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এ এলাকার ছেলে-মেয়েদের প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিতে হয়। কাঁচা ও ভাঙাচোরা সড়ক মাড়িয়ে পটিয়ায় যেতে হয় পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য। এতে শিশু, প্রসূতি মা ও বৃদ্ধদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। জরুরি সেবা নেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
তিনি আরও জানান, এ এলাকার মানুষ পাঁচুরিয়া থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেন। চাকরিজীবীরা কোলাগাঁওয়ের কালারপুল হয়ে চট্টগ্রাম নগরে যাতায়াত করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করেন সফর আলী মুন্সিরহাট থেকে। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবী। কেউ কেউ খাল-নদীতে মাছ ধরে, নৌকা ও সাম্পান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেকে আবার প্রবাসে রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মানিক বলেন, চরখিজিরপুরের বশির মেম্বার বাড়ি সংলগ্ন কালিধরপুল সড়কে ননাইয়ারমার ঘাটে যাওয়ার পথে যে কালভার্টটি ছিল, সেটি খালের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এক বছর আগেও সেখানে সিএনজি অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যান চলাচল করত। এখন যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে কোনো রকমে পার হচ্ছে। এখানে দ্রুত একটি টেকসই কালভার্ট বা সেতু নির্মাণ জরুরি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোটের আগে ভাঙনরোধ ও সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও ভোট শেষ হলে সব ভুলে যান জনপ্রতিনিধিরা। খালের ভাঙনে ইতিমধ্যে অনেক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। পুকুরপাড় ও জমির আইল ধরে চলাচল করতে হয় মানুষকে।
ননাইয়ারমার ঘাটে পাঁচ বছর ধরে খেয়া পারাপার করেন আবদুর শুক্কুর মাঝি। তিনি বলেন, ‘দেশে এত উন্নয়ন হলেও আমাদের এলাকায় তার কোনো ছোঁয়া নেই। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদসহ সব সেবা নিতে হয় পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে। খেয়া পারাপারে জনপ্রতি ৭ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। এখানে একটি সেতু হলে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’
স্থানীয়রা জানান, ২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ১৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ননাইয়ারমার ঘাট পাকা করে। তবে বোয়ালখালী অংশে কোনো সিঁড়ি না থাকায় বালির বস্তার ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করতে হয়, যা নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিপজ্জনক।
এ ছাড়া বোয়ালখালী খালের প্রায় ১০০ মিটার এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্লক ফেললেও আরও ৩ থেকে ৪ শ মিটার এলাকা তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন নিরব বলেন, পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের ছয়টি ওয়ার্ড বোয়ালখালী পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাকি তিনটি ওয়ার্ড (৭, ৮ ও ৯) দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এই তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে ‘চরখিজিরপুর’ নামে নতুন একটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের দাবি জানান তিনি। তার মতে, এতে অবহেলিত এলাকার মানুষের নাগরিক সেবা সহজ হবে এবং ভোগান্তি কমবে।