বাংলাদেশ, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ভোর ৫:১০

যাকে খুঁজি অস্তিত্বহীনতায়


প্রকাশের সময় :১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:৪৫ : পূর্বাহ্ণ

পায়েল বিশ্বাস:

আপনার এই আলোর ভেতর, জীবনের ভিড়ে আমি মুছে ফেলেছি আমার সব চিহ্ন— যেন কখনো ছিলামই না আপনার গল্পে। মুছে দিয়েছি চোখের জল, মুছে দিয়েছি হাসির রেখা, মুছে দিয়েছি সেই স্পর্শ-লাগা স্বপ্ন যা একদিন আপনাকেই কেন্দ্র করে ঘুরতো। এখন আপনার পৃথিবীর কোথাও আমার নাম নেই, ছায়া নেই, শ্বাস নেই— কেমন লাগে আপনার? বুকের ভেতর কোথাও একটু ফাঁকা লাগে না? কোনো রাত কি আপনাকে খানিকটা থামায় না আমার চলে যাওয়া স্মৃতির কাছে? আমার তো লাগতো— জ্বলতো, ছারখার হতো, কারণ আপনি ছিলেন, অথচ আমার দিকে তাকাতেন না। হাসতেন, কিন্তু সেই হাসিতে আমার জন্য কোনো কোণ ছিল না। আপনি পাশে থেকেও আমাকে ছুঁতেন না, ডাকতেন না, একটুখানি থামতেনও না। সেই অবহেলার আগুন এখনো পোড়ায় আমাকে প্রতিটি শ্বাসে। আপনার ভেতরে ডুবতে ডুবতে একসময় বুঝেছিলাম— সেখানে কোনো তল নেই, কোনো দাঁড়ানোর জায়গা নেই, আপনি যেন এক গভীর অতল— যেখানে নামলে মানুষ হারিয়েই যায়। আমার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছিল, রাতগুলো জমাট অন্ধকারে কাঁদতো, দিনগুলো দাঁত-মাঞ্জা একাকীত্বে দীর্ঘ হতো। আপনার অভিনয়ের ঝাপটায় মুছে গেল আমার কপালের টিপ, চোখের কাজল, ঠোঁটের লাল ছোঁয়া— একসময় যে ভালোবাসা গুছিয়ে রাখতাম, সব টুকরো-টাকরা উচ্ছ্বাস আপনার উদাসীনতার ধারেই গুঁড়িয়ে গেল। অপমান জমতে জমতে একদিন মনে হলো— আমি যেন কোনো অনাহূত চরিত্র আপনার একান্ত গল্পে। আপনার ব্যস্ততার পাথরচাপা অবহেলায় নুয়ে গেল আমার আকুতি, বুঝে গেলাম আপনার ভালোবাসার গলিতে আমার কোনো ঠিকানা নেই। জীবনের চারপাশে মানুষ ছিল, শব্দ ছিল, আলো ছিল— কিন্তু আমি আপনার অস্বীকারে মৃত্যুর মতো চুপ হয়ে গেলাম। তারপর— আপনার রক্তাক্ত উপেক্ষা পেরিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে, হোঁচট খেতে খেতে একদিন আমি পৌঁছে গেলাম এই অনাহূত নির্বাসনে। কোনো নাটক করিনি, কোনো অভিযোগ রেখে আসিনি, শুধু নিঃশব্দে সরে এসেছি— এমন ভঙ্গিতে যেন আমি কখনোই জন্মাইনি আপনার জীবনে। ফিরে তাকাই না আর। বলতেও যাবো না— কত গভীর আকুতি নিয়ে ফেরত যেতে চেয়েছিলাম। কতটা পরাজিত হয়েছিল আমার প্রেম। কতটা নিঃশেষ হয়ে উঠেছিল মন। শুধু একটাই জানতে ইচ্ছে করে— আপনি ভালো আছেন তো…? আমার এই পুরো অনুপস্থিতির ভেতর থাকুক আপনার ভাল থাকা। হ্যাঁ, আপনাকে ছেড়েও এ প্রশ্নটা জেগে ওঠে— আপনি ভালো আছেন তো…? তারপরও, জানেন— কখনো কখনো সন্ধ্যার আলো যতটুকু ঝিমিয়ে পড়ে ঠিক ততটুকু মনে পড়ে আপনার চোখের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যে চোখ একদিন আমাকে দেখেছিল, আসলে কি দেখেছিল? না কি শুধু ভেসে যাওয়া কোনো মুখ ভেবে অল্পক্ষণ থেমেছিল? আমি এখনো সেই দৃষ্টির ভেতর অল্প আলো খুঁজে ফিরি, যদিও জানি— সেখানে আলো ছিল না, ছিল অভিনয়ের ধূসর ছায়া। আপনার নীরবতার ভেতর আমার যত কথা ছিল— সব আজো ছুঁয়ে ওঠে রাতের আকাশে। কোনো তারার ঠিক নিচে দাঁড়ালেই অক্লান্ত কষ্টের মতো ফিরে আসে আপনি না–জানা আমার ব্যথা। আপনি যদি কখনো চোখ তুলে তাকাতেন, দেখতেন— আমি কেমন করে নিজেকে ছিঁড়ে এনে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সেই হাতই তো আমাকে ফেলে দিয়েছিল সবচেয়ে ভিতরের শূন্যতায়। কতবার ভেবেছি— হয়তো আমারও ভুল ছিল কোথাও, অতি বিশ্বাসে, অতি নির্ভরতায়, অতি আত্মসমর্পণে। কিন্তু ভুল কি ভালোবাসার? ভুল কি টানার, ডাকার, জড়িয়ে ধরে থাকার? আপনি কি সত্যিই বুঝতে পেরেছিলেন কী পরিমাণে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলাম আমি? নাকি আপনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের আরাম, নিজের পৃথিবী, নিজের অভিনয়ের পর্দা বদলে নিতে? এখনো মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ— কোনো অদ্ভুত স্মৃতির শব্দে। সেই শব্দটাও আপনার, যদিও আপনি এখন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত আমার জীবনে। নিঃশব্দতায় আমি শিখে গেছি কীভাবে মানুষ অভ্যাসের মতো কাউকে ভালোবাসে, আঁচরের মতো ভুলে যায়, আর ইতিহাসের মতো চিরকাল রেখে দেয় ভিতরকার কোনো ব্যথাকে। এখন আমি দূরে— অত দূরে, যেখানে আপনার কোনো স্মৃতি আমাকে আর আঘাত করার ক্ষমতা রাখে না, তবু অদ্ভুতভাবে আঘাত করেই যায়। কতবার নিজেকে বলেছি— এবার থেমে যাক ব্যথা, এবার শেষ হোক স্মৃতি। কিন্তু তা হয় না— কারণ যাকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসা যায় সেই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি দহন করে। তবু, জানেন— এই দীর্ঘ না-থাকা, না–বলা, না–ফেরা সবকিছুর নিচে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। যেন এতসব যন্ত্রণার পরও আমি বেঁচে আছি, অটল আছি, শ্বাস নিচ্ছি নিজের মতো করে। আমার সমস্ত ছাড়াছাড়ির মধ্যেও কোথাও যেন হালকা আলো আছে, যাকে আমি নিজের বলে চিনেছি— আপনার নয়। তবুও শেষ প্রশ্নটা ফিরে আসে— বুকে কেমন করে যেন উঠে আসে— আপনি ভালো আছেন তো…? সত্যিই ভালো আছেন তো? আমার অনুপস্থিতির বিশাল অন্ধকারে আপনার আলোটা কি জ্বলছে ঠিকঠাক? আমার আর না–থাকা আপনাকে একটু হলেও হালকা করে দিয়েছে তো? কারণ আমি তো— এই সমগ্র শূন্যতায়ও আপনার ভালো থাকা কামনা করি। যদিও জানি— এই কামনাটা আপনাকে কখনো ছুঁয়ে যাবে না।

ট্যাগ :